রাইট টার্ন
সাংসদের নৈতিকতা এবং সংসদের মর্যাদা
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গণতন্ত্রে আইনপ্রণেতা তথা সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা শুধু আইন মেনে চলা নয়; তাদের নৈতিকতাপূর্ণ জীবনযাপন ও নেতৃত্বও জনগণ দেখতে চায়। কারণ, সংসদ সদস্য কেবল নিজের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের মূল্যবোধেরও প্রতিনিধি। তাই তাঁর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত কৌতূহলের বিষয় নয়, জনআস্থার বিষয়ও বটে।
সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে এমন প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। সাধারণ নাগরিক আইন ভঙ্গ করলে তিনি মূলত আইনের কাছে জবাবদিহি করেন; সংসদ সদস্য নিজেই আইন প্রণেতা। তিনি এমন আইন প্রণয়নে অংশ নেন, যা কোটি কোটি মানুষের অধিকার, দায়িত্ব ও আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে আইনপ্রণেতার ব্যক্তিগত আচরণও আদতে জনআস্থার সঙ্গে জড়িত। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ আইনগতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে কিনা– সেই প্রশ্নকে ছাপিয়ে যায় সেই আচরণ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারছে কিনা। এ কারণেই বিভিন্ন সংসদীয় গণতন্ত্রে আইনগত জবাবদিহির পাশাপাশি সংসদীয় জবাবদিহিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্প্রতি কয়েকজন সংসদ সদস্য ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনার সত্যতা ও আইনি দিক নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঘটনাগুলো আমাদের সামনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রথমটি সংসদ সদস্যদের নৈতিক জবাবদিহি; দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো ঘটনাটির ভিডিও ও চিত্র ছড়িয়ে দেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে।
বিশেষত একটি ঘটনায় দৃশ্যত অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। তা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এই আলোচনার মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত। তা হলো: আলোচ্য ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কের অধিকার কি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে অনুসমর্থনকারী দেশ। এই সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিশু-সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম বা পদক্ষেপে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩-এর মূল দর্শনও শিশুর সুরক্ষা।
একজন জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যেমন সংবাদ প্রকাশ হওয়া জরুরি; একই সঙ্গে সেখানে জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কের অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটি নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল যুগে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভিডিও একবার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা কার্যত স্থায়ী হয়ে যায়। আজকের একটি অসতর্ক প্রকাশ একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের শিক্ষা, কর্মজীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। জনস্বার্থ রক্ষা করা এবং জনকৌতূহল মেটানো এক বিষয় নয়।
একটি ঘটনার একাধিক মাত্রা থাকতে পারে। একজন সংসদ সদস্যের আচরণ রাজনৈতিকভাবে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; সংসদীয়ভাবে জাতীয় সংসদের মর্যাদা ও বিশেষ অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে প্রচলিত আইনের অধীন ফৌজদারি তদন্তের বিষয়ও হতে পারে। এই তিনটি প্রক্রিয়া একে অপরের বিকল্প নয়; বরং ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। একটি পরিণত গণতন্ত্রে তিনটিই নিজ নিজ সাংবিধানিক ও আইনি সীমার মধ্যে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। এতে ব্যক্তি নয়; প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিশেষ অধিকার কমিটির মাধ্যমে সংসদের মর্যাদা ও বিশেষ অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন বিবেচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কি সেই ব্যবস্থার আওতায় সংসদের বিবেচনার দাবি রাখে?
গত এপ্রিল মাসে সংসদে সরকারি দলের একজন সদস্যের মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিরোধী দলের যাকে নিয়ে সেই মন্তব্য, তিনি ‘জীবন, সম্মান ও মর্যাদা’ ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নোটিশটি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, সংসদ সদস্যের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নটি এখানে সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপিত হয়েছে। এরপর তিনি বিষয়টি অধিকতর পরীক্ষা, তদন্ত এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পেশের জন্য তাৎক্ষণিক বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠান।
যদি সংসদের ভেতরে একজন সদস্যের সম্মানহানির প্রশ্ন সংসদের বিশেষ অধিকার কমিটির বিবেচ্য হতে পারে, তাহলে সংসদের বাইরে সংঘটিত এমন ঘটনাও, যা সংসদের সামগ্রিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা কি সংসদের বিবেচনার বিষয় হতে পারে না? বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় সংসদ, আইনজ্ঞ এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা হওয়া দরকার। একই সঙ্গে জনপরিসরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা বিষয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। সামাজিক মাধ্যমে যারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি নিয়েও উপযুক্ত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদ থেকে আসা দরকার।
গণতন্ত্রে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন সংসদ সদস্যের নৈতিক বিচ্যুতি যেমন জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে, তেমনি একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের অধিকার উপেক্ষাও সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে।
একটি সভ্য গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতে নয়; সবচেয়ে দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্যেও নিহিত। সংসদ সদস্যদের নৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা– এ দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়। একটি পরিণত গণতন্ত্র একসঙ্গে দুটিই করতে পারে এবং আমাদের দেশে সেটি করতেই হবে।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা
ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী