ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

শোকযাত্রা থেকে দ্রোহযাত্রায় রূপান্তর

শোকযাত্রা থেকে দ্রোহযাত্রায় রূপান্তর
×

রাফিকুজ্জামান ফরিদ

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৯

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মৃতিতে বড় স্থান নিয়ে থাকবে আজীবন। গণঅভ্যুত্থান দেখতে ও তাতে অংশ নিতে সবাই পারে না। আমাদের সেই সুযোগ হয়েছিল। এ আন্দোলনের প্রধান কারিগর ছিল জনগণ। এত ব্যাপক ও বিচিত্র ধরনের জনসম্পৃক্ততা, আর এত বড় সংখ্যার প্রাণহানি স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশে কখনও দেখা যায়নি।

আমি ছাত্র আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম এবং বিরাট মিছিলের একজন ছিলাম। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে আন্দোলনের যে প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছিল, সেখানে আমার সংগঠন ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট’ ও ছাত্র সংগঠনগুলোর যে জোটে আমরা আছি, সেই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ তাদের সাধ্য অনুসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

শোক থেকে দ্রোহ 

১৬ জুলাই, রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের দুহাত প্রসারিত করে শাসকের বুলেটকে আহ্বান করার দৃশ্য এই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীকে পরিণত হয়। আবু সাঈদ যে মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হন, তখন তাঁর কাছেই ছিলেন ছাত্র ফ্রন্ট রংপুর জেলা শাখার সভাপতি সাজু বাসফোর। সাজুই রিকশায় করে গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সাজু বাসফোর আবু সাঈদ হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী। 

১৯ জুলাই রাতে হাসিনা সরকার কারফিউ জারি করে। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট সংযোগ; রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেনাবাহিনীর টহল আর সাঁজোয়া যান। কারফিউ জারির পর ২৬ জুলাই রাস্তায় প্রথম পা দেন সংস্কৃতিকর্মীরা; গানের মিছিলের মাধ্যমে। এদিন বিকেলে পল্টন এলাকায় শোক মিছিল করে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। এরপর প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কর্মসূচি ছিল।

গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের মধ্যে আগে থেকেই একটা আলোচনা চলছিল– সবাইকে যুক্ত করে শহীদদের স্মরণে একটি নাগরিক শোক মিছিল আমরা করতে পারি কিনা। এ বিষয়ে ৩১ সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট (বর্তমানে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য) ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যখন আমাদের কথা হয়, তখন দেখি তারাও একই রকম ভাবছেন। এরই ধারবাহিকতায় ৩১ সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, নারী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠনসহ আন্দোলনে সক্রিয় সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে ২ আগস্ট ‘শোকযাত্রা’ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে পাল্লা দিয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়ছিল; সবার দাবি ও আকাঙ্ক্ষা যেভাবে শেখ হাসিনার পতনের এক দাবিতে এসে কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল; সেটা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এখন ‘শোকযাত্রা’ মানায় না। তখন আমরা এ কর্মসূচির নাম শোকযাত্রার বদলে ‘দ্রোহযাত্রা’ ঘোষণা করি।

২ আগস্ট বিকেল ৩টায় প্রেস ক্লাবে ছিল আমাদের সমাবেশ। সেখান থেকে শুরু হয়ে ‘দ্রোহযাত্রা’ শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হবে। দুপুর ১টা থেকেই প্রেস ক্লাবের সামনে লোক জড়ো হতে থাকে। ফলে আমরা আমাদের আয়োজনও শুরু করি নির্ধারিত সময়ের আগে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলতে থাকে আর বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। আমাদের ব্যানারে লেখা ছিল ‘রক্তের দাগ দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। এ সমাবেশে ঢাকা শহরের শ্রমিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছিল। বৃষ্টির কারণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা সংক্ষিপ্ত করে আমরা দ্রুত দ্রোহযাত্রা শুরু করি।

দ্রোহযাত্রা শুরুর প্রাক্কালে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তাঁর সভাপতির ভাষণে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। হাজার হাজার মানুষের ‘দ্রোহযাত্রা’ জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হয়ে হাইকোর্ট-দোয়েল চত্বর-টিএসসি হয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এই ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকে স্পষ্টভাবে সরকারের পদত্যাগের এক দফা ঘোষণা করা হয়। এর আগে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এক দফা উচ্চারিত হচ্ছিল, কিন্তু সম্মিলিতভাবে ‘দ্রোহযাত্রা’ থেকেই এটা সবার সামনে আসে। এরপর ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে খুনি শেখ হাসিনার ডাকা সংলাপ প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া হয়। ৪ আগস্ট শাহবাগ চত্বরে ডাকা সমাবেশ থেকে ৫ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। স্লোগান ওঠে ‘ছাড়তে হবে ক্ষমতা, ঢাকায় আসছে জনতা’। 

সরকার নিজেকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে ৪ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। তাতে শেষ রক্ষা হয়নি খুনি হাসিনার। ছাত্র-জনতা কারফিউ ভেঙে ঢাকার রাজপথ ও গণভবন দখল করেন। এর আগেই শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।

গণঅভ্যুত্থান শেষ হয়েছে, লড়াই নয়

বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক মাইলফলকের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম আমরা। আজও আছি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে লড়াই থামে না। বরং গণঅভ্যুত্থানের গণচেতনা রক্ষার জন্য এ লড়াই আরও বিপুল বেগে চালিয়ে নিতে হয়। আমরা সেই লড়াই আজও চালিয়ে যাচ্ছি।

রাফিকুজ্জামান ফরিদ: সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট 

আরও পড়ুন

×