উচ্চশিক্ষা
আত্তীকরণ সংকট এবং বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ভবিষ্যৎ
মো. মারুফ কবির
মো. মারুফ কবির
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫২ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৯
যে কোনো দেশের সিভিল সার্ভিসের মূল শক্তি মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পেশাদারিত্ব। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান রক্ষায় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার দীর্ঘদিন ধরে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। অন্যান্য ক্যাডারের মতো এই ক্যাডার ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক জারি করা ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১’ অনুসারে গঠিত হয়। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি কলেজ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষাক্রমের প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পাদন এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা।
কঠোর প্রতিযোগিতা, প্রিলিমিনারি, লিখিত আর ভাইভার দীর্ঘ বৈতরণী পার হয়ে একজন তরুণ যখন ‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার’ হিসেবে সরকারি কলেজে যোগ দেন, তখন তাঁর চোখে থাকে শিক্ষার মানোন্নয়ন আর মর্যাদার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের আওতাভুক্ত শিক্ষকদের ‘আত্তীকরণ’ করার প্রক্রিয়াটি এই সার্ভিসে এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। এই প্রথা একদিকে যেমন সরাসরি পরীক্ষা দিয়ে আসা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, অন্যদিকে ক্যাডারের সামগ্রিক ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে দিচ্ছে। তথাকথিত এবং অপরিকল্পিত ‘আত্তীকরণ প্রথা’ আজ শিক্ষা ক্যাডারের মূল ভিত্তি এবং মেধার মূল্যায়নকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করেছে। যে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এই ক্যাডার গড়ে উঠেছিল, তা আজ নীতিমালার মারপ্যাঁচে পিষ্ট।
এই বাস্তবতা এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে– কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আসা একজন ক্যাডার কর্মকর্তা আর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ক্যাডার পদমর্যাদা পাওয়া একজন শিক্ষকের অবস্থান কি প্রশাসনিকভাবে এক হতে পারে?
সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছে, ‘সরকারীকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’-এর অধীনে নতুন সরকারীকৃত কলেজের নন-ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা নিজেদের ক্যাডারভুক্ত করার জন্য আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা জানি, একটি বেসরকারি কলেজ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়।
একটি ভুল ধারণা আমাদের মগজে স্থান পেয়েছে। তা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ মানেই শিক্ষার উন্নয়ন! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণে কখনও শিক্ষার গুণগত মানের কথা চিন্তা করা হয় না, রাজনৈতিক দেনদরবারই এখানে মুখ্য। অর্থাৎ একথা বলা যেতে পারে, নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ মানেই হাই-ভোল্টেজ রাজনীতি এবং উচ্চমানের লেনদেন।
প্রথমে বেসরকারি, পরে এমপিওভুক্ত, সর্বশেষ সরকারীকরণের মাধ্যমে তারা যে সুবিধা পায়, তারা নিজেদের ওই স্থানে রেখে বেশ পুলকিত বোধ করেন না। তখন তারা বনে যেতে চান ‘বিসিএস ক্যাডার’! যে বিসিএস পরীক্ষায় সফলতার পেছনে প্রত্যেক কর্মকর্তার রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তারা মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে এই সম্মানকে নিজেদের নামে আটকাতে চান।
এই সুযোগ করে দিয়েছে বিগত শাসনামলে প্রথম মেয়াদের (১৯৯৬-২০০১) শেষ দিকে করা আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০। এই অপরিণামদর্শী বিধিমালা নতুন সরকারীকৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তির সুযোগ করে দিয়েছিল। এতে প্রকৃত ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা পড়েন মুসিবতে।
২০০০ সালের বিধিমালায় আত্তীকৃত শিক্ষকদের আগের বেসরকারি আমলের চাকরির একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: কার্যকর চাকরিকালের অর্ধেক) গণনা করার সুযোগ ছিল। এর ফলে দেখা যেত, সরাসরি বিসিএস দিয়ে আসা একজন কর্মকর্তা তাঁর চেয়ে ১০ বছর পরে সরকারি হওয়া শিক্ষকের জুনিয়র হয়ে গেছেন। আত্তীকৃত শিক্ষকরা এসে ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ তালিকায় ওপর দিকে বসে যাওয়ায়, সরাসরি আসা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বছরের পর বছর আটকে যায়।
যার আঘাত এখনও স্পষ্ট। ৩৬তম বিসিএসের (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের শিক্ষকদের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। ২০১৮ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই শিক্ষকরা দীর্ঘ আট বছর ধরে আজও ‘প্রভাষক’ পদেই স্তিমিত হয়ে আছেন। অথচ তাদের চোখের সামনে ৩৮তম বিসিএসের সাধারণ ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। অনুরূপভাবে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ৩৭ ও ৩৮ ব্যাচের শিক্ষকরা পদোন্নতির যোগ্য হলেও প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় বিগত শাসনামলে নব্য সরকারীকৃত কলেজ শিক্ষকদের নন ক্যাডার রাখার সিদ্ধান্ত রেখে ‘সরকারীকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। যেখানে আরও বলা হয়, নব্য সরকারীকৃত কলেজের শিক্ষকদের তাদের নির্দিষ্ট কলেজে চাকরিকাল অতিবাহিত করতে হবে। ক্যাডারভুক্ত হতে চাইলে দিতে হবে পরীক্ষা, যা বিপিএসসি পরিচালনা করবে।
বিষয়টি অযৌক্তিক কিছু নয়। যারা ক্যাডারভুক্ত হতে চান, তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবে। কঠিন কিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অটো) পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের মধ্যে জেঁকে বসে আছে, যা জাতির পুনর্গঠনে ক্ষতির কারণ।
এখন আত্তীকরণ বিধি-২০১৮-এর আওতায় সরকারীকরণ হওয়া শিক্ষকদের দাবি তাদেরকে ২০০০ বিধির মতো সরাসরি ক্যাডারভুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে; দিতে হবে বদলি সুবিধা। বলে রাখা ভালো, ২০০০ বিধিতে অটো ক্যাডার হওয়া অসংখ্য শিক্ষক বিধির ফাঁকফোকর দিয়ে ‘এ’ শ্রেণির কলেজে বদলি সুবিধা নিয়েছেন এবং তাদের কর্মদক্ষতা শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষা ক্যাডারের দুর্বলতা হিসেবে ধরা দিয়েছে। বিষয়টি কিছুটা এই প্রবাদের মতো– ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’। ফলে বিভিন্ন মহলে যৌক্তিক সমালোচনার পরে সরকার ২০১৮ বিধিতে এই সুযোগ রাখেনি।
রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব এবং সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে ওই রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রশাসন কেমন পরিবেশ ভোগ করছে তার ওপর। মস্তিষ্ককে সংকটে রেখে যেমন শরীরের অন্যান্য অঙ্গ সানন্দে কার্যপ্রক্রিয়া সম্পাদন করতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রশাসনকে সংকটে রেখে একটি রাষ্ট্র সর্বজনীন কল্যাণ, টেকসই উন্নয়ন ও সামগ্রিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না।
সরকার সাম্প্রতিক বাজেটে শিক্ষা খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে। কেবল বিপুল বাজেট বরাদ্দ দেওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান নয়; প্রয়োজন যোগ্য, মেধাবী এবং পরিশ্রমী প্রার্থীদের শিক্ষাসেবায় আকৃষ্ট করা। এই লক্ষ্য অর্জনে বর্তমানে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তাদের মেধা ও উপযুক্ততাকে শতভাগ কাজে লাগাতে হবে এবং শিক্ষা খাতের অভ্যন্তরে পর্যায়ক্রমে সব সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্যাডার বৈষম্য দূরীকরণ প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হতে পারে। প্রয়োজনে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করে হলেও ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করা কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয় উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় বছরের পর বছর ধরে চলা ‘আত্তীকরণ সমস্যা’ জিইয়ে রেখে ‘পদোন্নতির জট’ মুক্ত করা যেমন অসম্ভব, তেমনি মেধাবীদের শিক্ষা ক্যাডারে ধরে রেখে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলাও সুদূরপরাহত।
সুতরাং শুধু জাতীয়করণের রাজনৈতিক বা সামাজিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে যদি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের পেশাগত কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাই মুখ থুবড়ে পড়বে।
পরিশেষে, যত্রতত্র প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ এবং কোনো প্রকার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ‘সরকারীকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’-এর আওতায় নব্য সরকারি কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডার পদমর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ কলেজে বদলির সুযোগ দেওয়ার অযৌক্তিক দাবি শিক্ষা খাতের গুণগত মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কেবল অবকাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সরকারীকরণই শিক্ষার মানোন্নয়নের চাবিকাঠি হতে পারে না; বরং যাকে-তাকে ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করার এই সংস্কৃতি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কাঠামোগত ভিত্তি ও মর্যাদা ধূলিসাৎ করছে।
লেখক: মো. মারুফ কবির; বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য এবং ‘দ্য অ্যাডভাইজর্স: থিংক ট্যাঙ্ক অব সিভিল এডুকেশনের’ সঙ্গে যুক্ত
- বিষয় :
- বিসিএস পরীক্ষা
- শিক্ষা
- সরকারি কর্ম কমিশন