ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাইট টার্ন

উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ ভালো, রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত

উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ ভালো, রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। 

বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে শিক্ষিত বেকার প্রায় চার কোটি। সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে চাকরির বাজারে তীব্র চাপের বাস্তবতা অস্বীকারের উপায় নেই। ছোট একটি পদেও হাজার হাজার, কখনও লাখের বেশি আবেদন জমা পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখন আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নয়।
এই বাস্তবতায় তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সরকারি আহ্বান অবশ্যই সময়োপযোগী। কৃষি, মৎস্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গ্রামীণ শিল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাসহ সব ক্ষেত্রেই নতুন উদ্যোক্তার প্রয়োজন। কিন্তু আহ্বান জানালেই উদ্যোক্তা তৈরি হয় না। উদ্যোক্তা গড়ে ওঠে এমন একটি পরিবেশে, যেখানে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ, আইনের সুরক্ষা এবং ব্যর্থতার পরও আবার শুরু করার সুযোগ নিশ্চিত থাকে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে?

এ দেশে নতুন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় বাধা পুঁজির সংকট। অধিকাংশ তরুণের নিজস্ব সঞ্চয় বা পারিবারিক বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। ফলে ব্যাংক ঋণই প্রধান ভরসা হলেও জামানত, জটিল প্রক্রিয়া, উচ্চ সুদ ও নানা আনুষ্ঠানিকতার কারণে সহজে কেউ ব্যাংকে যেতে চায় না।
কারিগরি সহায়তার ঘাটতি আরেকটি বড় বাধা। ব্যবসা কীভাবে পরিকল্পনা করতে হয়, বাজার বিশ্লেষণ, হিসাবরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল বিপণন কিংবা রপ্তানির নিয়মসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে উদ্যোক্তার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক সহায়তা থাকে না। দেশে প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অভাব না থাকলেও প্রশিক্ষণের পর হাতে-কলমে পরামর্শ, মেন্টরশিপ, প্রযুক্তি সহায়তা ও বাজার সংযোগের অভাব প্রকট। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগও প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যায়।

গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা আরও কঠিন। কোনো তরুণ যদি মাছের খামার গড়ে তোলেন, তাঁর উদ্বেগ শুধু উৎপাদন নয়; রাতের আঁধারে মাছ চুরি হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও। কোথাও পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে। কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারা অপরিপক্ব ফসল চুরি, ফল নষ্ট করা কিংবা জমি দখলের হুমকির মুখোমুখি হন। অনেক এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক অংশীদার হওয়ার চেষ্টা কিংবা অযৌক্তিক হয়রানির ঘটনা ঘটে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় তরুণের কাছে চাকরি ব্যবসার চেয়ে নিরাপদ বিকল্প।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। উদ্যোক্তার জন্য নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেন। ফলে উদ্যোক্তাকে রক্ষা করা মানে ভবিষ্যতে অনেকের চাকরির সম্ভাবনা তৈরি করা।

উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকার তরুণদের কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যেমন– ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ মে ২০২৭ পর্যন্ত আখ উৎপাদন এলাকায় ব্যক্তিমালিকানায় গুড়, চিনি ও চিনিজাত দ্রব্য উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। তবে উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যের সঙ্গে এ ধরনের নীতির সামঞ্জস্য এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব আগেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
উদ্যোক্তা তৈরির পথে সামাজিক মানসিকতাও বড় বাধা। বেশির ভাগ পরিবার সরকারি চাকরিকেই সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশা মনে করে। ফলে ব্যবসা শুরু করতে চাওয়া অনেক তরুণ পরিবার থেকেই নিরুৎসাহিত হন। আবার ব্যবসায় ব্যর্থতাকে শেখার অভিজ্ঞতা নয়, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ বিশ্বের সফল উদ্যোক্তার পথচলায় একাধিক ব্যর্থতা রয়েছে। উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থেকে শেখার গুরুত্ব রয়েছে।

তবে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না, সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন জাতীয় উদ্যোক্তা নীতি। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন বা আংশিক জামানতভিত্তিক ঋণ সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রতিটি জেলায় উদ্যোক্তা সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলে ব্যবসা পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, বিপণন, আইনগত পরামর্শ, হিসাব ব্যবস্থাপনাসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয় ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ হিসেবে দিলে তরুণ উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। এতে তরুণ উদ্যোক্তাকে সেবা পেতে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে না। একই সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও কমিউনিটির সমন্বয়ে দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ফসল, মাছ ও গবাদিপশুর জন্য কার্যকর বীমা ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ জরুরি।
উদ্যোক্তাবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কোনো আইন, প্রজ্ঞাপন বা বিধিনিষেধ জারির আগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোক্তা দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে শুধু ব্যবসা প্রশাসন নয়; কৃষি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানসহ সব বিষয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নকে পাঠ্যক্রমের অংশ করতে হবে। যাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তরুণও বেরিয়ে আসে।

সব শেষে একটি নীতিগত প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বর্তমান সরকার বলছে, গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের ভিত্তি গড়ে তুলতে একটি তথ্যভিত্তিক শ্বেতপত্র প্রকাশ করলে খাতভিত্তিক ক্ষতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা ও কোথায় বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে জানা যাবে। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে একটি জাতীয় রোডম্যাপ প্রকাশ করলে সরকার, বিনিয়োগকারী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিকল্পনা আরও বাস্তবভিত্তিকভাবে সাজাতে পারবে।
দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বেকারত্ব নয়, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শুধু চাকরি দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তাই উদ্যোক্তা তৈরির বিকল্প নেই। তবে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বানের আগে রাষ্ট্রকে নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ, সহজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আইনের কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ‘উদ্যোক্তা হও’ আহ্বানটি অনুপ্রেরণামূলক স্লোগান হয়েই থাকবে, বাস্তব পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়।
মনে রাখতে হবে একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের জীবিকাই গড়ে তোলেন না; অন্যের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। তাই উদ্যোক্তায় বিনিয়োগ মানে কেবল একজন ব্যক্তিতে বিনিয়োগ নয়, দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; 
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×