ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে হট্টগোল

সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য

সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বৎসর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্র লইয়া যেই প্রকার বিশৃঙ্খলা হইয়াছে, উহা অনভিপ্রেত। শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদানের ন্যায় মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে এহেন পরিস্থিতির উদ্ভব কেবল আয়োজনের পরিবেশকেই ক্ষুণ্ন করে নাই; দলগুলির দেওয়া জাতীয় ঐক্যের প্রতিশ্রুতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাইয়াছে। আরও হতাশাজনক বিষয় হইলো, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতে এহেন বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে, যেইখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাহারা যেইভাবে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করিয়াছেন, উহা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করিতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়া বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, তথ্যচিত্রটির প্রদর্শন শেষ হইবার পরপরই দর্শক সারিতে থাকা জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের একাংশ নানা নেতিবাচক স্লোগান দিয়া প্রতিবাদ জানাইতে শুরু করেন। তাহাদের অভিযোগ, তথ্যচিত্রে আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ পড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া ২০২৪ সালের ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের অনুপস্থিতি, এক দফা ঘোষণা ও ৯ দফা লইয়া তথ্যের অসংগতির অভিযোগও তাহারা তুলিয়াছেন।

নিঃসন্দেহে, তথ্যচিত্রে গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী-জনতার ভূমিকা যথাযথভাবে তুলিয়া ধরিবার ক্ষেত্রে যদি কোনো ব্যর্থতা থাকিয়া থাকে তাহা হতাশাজনক। ইহা সত্য যে, গণঅভ্যুত্থানে সকল শ্রেণিপেশার মানুষ এবং সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকিলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করাই সম্মুখসারিতে ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস তুলিয়া ধরিতে হইলে ১ জুলাই আন্দোলনের সূচনা হইতে ৫ আগস্ট উহার সমাপ্তি পর্যন্ত ঘটনাক্রম সঠিকভাবে তুলিয়া ধরিবার বিকল্প নাই। তদুপরি, খোদ রাষ্ট্রপতিও তাহার বক্তব্যে বলিয়াছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান লইয়া নির্মিত যেই তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের ছবি নাই তাহাকে কোনো তথ্যচিত্র বলা যায় না। তবে যত অভিযোগই থাকুক সেইগুলির প্রকাশ হওয়া উচিত ছিল সভ্য, গণতান্ত্রিক ও শালীন উপায়ে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে বিশৃঙ্খলার মঞ্চে পরিণত করা কিংবা আবেগের বশবর্তী হইয়া অনুষ্ঠান ব্যাহত করা কোনো বিবেচনাপ্রসূত কর্ম হইতে পারে না। উক্ত হট্টগোল আর যাহাই হউক অন্তত শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সম্মান জানাইবার অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্যকে নষ্ট করিবার পাশাপাশি তাহাদের অনুভূতির প্রতিও প্রয়োজনীয় সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। আরও বেদনাদায়ক বিষয় হইল, সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অভিযোগকারীদের হুমকি-ধমকি দিয়াছেন তাহাও অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়াছে। 

আমরা মনে করি, জুলাইয়ের তথ্যচিত্রটি গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সম্মুখে প্রদর্শনের পর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। তাহা হইলে বিষয়বস্তু ও ইতিহাস বিকৃতির যে কোনো অভিযোগ পূর্বেই পর্যালোচনার সুযোগ থাকিত। তাহা না করায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিপক্বতা, সহনশীলতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা লইয়াই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানে অসুন্দর যাহা কিছু ঘটিয়াছে তাহার দায় মন্ত্রণালয়ও এড়াইতে পারে না, যদিও ঘটনার পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী দুঃখপ্রকাশ করিয়া তথ্যচিত্রটি সংশোধন করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। উক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দিকটাও খতাইয়া দেখা জরুরি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে দলীয়করণের সুযোগ নাই। সেই ইতিহাস যেন নির্মোহভাবে তথ্যচিত্রে উঠিয়া আসে, উহা নিশ্চিত করিতে হইবে। আমাদের বিশ্বাস, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিভাজন নহে, বরং ঐক্য, গণতন্ত্র ও জবাবদিহির শিক্ষা দেয়। সেই চেতনা ধারণ করিতে হইলে মতভিন্নতাকে সংঘাতে নহে, সংলাপে রূপ দিতে হইবে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা আবেগের সংঘর্ষের ক্ষেত্র বানানো বুদ্ধিমানের পরিচায়ক নহে, বরং জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। 
 

আরও পড়ুন

×