শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা
বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিগত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষাঙ্গনে পুরোনো রাজনীতি ফিরে আসছে কিনা। সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ‘আধিপত্যের লড়াইয়ে ছাত্রদল-শিবির’ শিরোনামের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে তার কিছু ইঙ্গিত উঠে এসেছে।
ক্যাম্পাসগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রভাব থাকা অনেকটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত প্রতিটি সরকারের সময় তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে, গত দেড় দশকে ছাত্রলীগ শিক্ষাঙ্গনে শুধু একক রাজত্বই কায়েম করেনি, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষ শিক্ষার্থীদের মারধর, এমনকি প্রাণহানিও ঘটিয়েছে। বুয়েটের শহীদ আবরার ফাহাদ ছাত্রলীগেরই সন্ত্রাসের শিকার। এসব ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের আগেই জুলাইয়ের মধ্যভাগে তাদের প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসছাড়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসে সন্ত্রাসবিরেধী আইনে নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যে ঐক্য, সংহতি ও সহাবস্থান দেখা গেছে, সেখান থেকে বিচ্যুতিসম নতুন সংঘর্ষ তাই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রত্যাশা ছিল, ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকবে। সব ছাত্রসংগঠন নির্বিঘ্নে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারবে। কারও একক রাজত্ব থাকবে না। কেউ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। শিক্ষাঙ্গনে ও দেশে বৈষম্য বিলোপের প্রত্যাশায় শহীদ আবু সাঈদসহ সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। নতুন করে ক্যাম্পাসে যদি একদলের আধিপত্য কায়েম হয়, তা হবে শহীদদের অবমাননা।
দুঃখজনক হলো, গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উদযাপনের সময়ে এসেই এ ধরনের সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। ছাত্রদল-ছাত্রশিবির দুপক্ষই একে অপরকে দুষছে। উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের মুখেই হুমকি ও উস্কানিমূলক ভাষা দেখা যাচ্ছে। ছাত্রদল সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটসহ কোথাও কোথাও থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বের করে দিয়েছে। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় দুপক্ষের দফায় দফায় হামলায় সেখানকার অধ্যক্ষ পর্যন্ত আহত হয়েছেন। সেখানকার দুটি আবাসিক হলের উভয়টিই এখন বন্ধ আছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ভয়ানক ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে হাসপাতালে গিয়েও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য সংঘর্ষ হলেও পরে দুই সংগঠনের ছাত্রনেতারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মসূচিতে মিলিত হয়েছেন।
বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হামলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত এপ্রিলে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়েও দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়েছিল। দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যেখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোতেই ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ফলে সেখানে তাদের এক ধরনের প্রভাব আছে। ছাত্রদল সম্ভবত এ প্রভাব মেনে নিতে রাজি নয়। তারা ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন। এই মনস্তত্ত্বও সংঘর্ষের কারণ বৈকি। সরকারও ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিএনপি সমর্থিত শিক্ষকদের ভিসি-প্রোভিসিসহ বিভিন্নি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়োজিত করেছে। ছাত্রদলের জন্য এটিও শক্তির জায়গা বটে।
যদিও ছাত্রদল বলছে, তারা দখলবাজির পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরতে চায় না। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন হওয়ার পরও তারা যে ছাত্রলীগ হয়ে উঠতে চায় না, এটা ইতিবাচক। ছাত্রদল ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারে, যদি তারা শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি চালিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া পূরণ এবং শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দখল ও টেন্ডারবাজি থেকে তাদের দূরে থাকতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ছাত্রদের দলের নেতৃত্ব দিতে হবে এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে বের হতে হবে।
প্রশ্ন হলো, এটি তাদের মুরব্বি সংগঠন তথা ক্ষমতাসীন দল বিএনপি চায় কিনা। বিএনপি যদি ছাত্রদলকে তাদের মতো রাজনীতি করতে দেয় এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তারা ভূমিকা রাখে, তাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল ভালো করবে, আশা করা যায়। ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল কোনো ছাত্রসংগঠনই যেখানে পেছনে ফেরত যেতে চায় না, সেখানে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে ‘ছাত্র সংসদ’। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হলে এবং প্রতিটি ছাত্রসংগঠন পরিকল্পতিভাবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করলে, নির্বাচনে বেশ প্রতিযোগিতাও দেখা যাবে। একক প্যানেল থেকে না হয়ে বিভিন্ন প্যানেল থেকে ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব উঠে এলে তখন কারও একক আধিপত্যেরও প্রশ্ন উঠবে না।
এখানেও ক্ষমতাসীনসহ বড় দলগুলোর সদিচ্ছা জরুরি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনোভাব তাদের বুঝতে হবে। ক্যাম্পাসে এখন কেউই পেশিশক্তির রাজনীতি চায় না। মঙ্গলবার অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বরদাশত করবেন না। সেজন্য করণীয় হলো, সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও দখলবাজির ঘটনাগুলোকে আমলে নিয়ে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এপ্রিলে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এবারও যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ও সহাবস্থানের বিষয়ে কেবল কথা নয়, কাজ জরুরি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে সংঘাত প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? ছাত্রসংগঠনগুলোকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা যদি নিরপেক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ভূমিকা না রাখে, পরিস্থিতি খারাপ হবে। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারেও তাদের সক্রিয় থাকতে হবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল।
[email protected]