রাষ্ট্র
গণঅভ্যুত্থানেও কর্তৃত্ববাদ শেষ হয় না যে কারণে
মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাতচল্লিশের দেশভাগের পর একটা দীর্ঘ গণতন্ত্রের লড়াই আমরা লক্ষ্য করেছি। গণতন্ত্রের লড়াই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে গড়ায়। একটা নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পরবর্তীকালেও সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম আমরা দেখেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও আক্ষেপের বিষয়, গণতন্ত্রের একটা লেবাস আমরা দেখলেও ভেতরে বরাবরই তা ছিল কর্তৃত্ববাদ। এই কর্তৃত্ববাদ শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারগুলোতে তা দেখা গেছে। পরিবারে ভাঙনের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্তৃত্ববাদ।
যার এতটুকু ক্ষমতা আছে, সেই ক্ষমতাই কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়। কর্তৃত্ববাদই পরে স্বৈরাচার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে উপেক্ষা করার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তা পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এর সর্বত্র প্রয়োগ দেখা যায়। মেধা মূল্যায়নের বিষয়টি যেহেতু শিক্ষকদের হাতে, তাই কিছু শিক্ষক প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্য়ন্ত নিবিড় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের পক্ষপাতমূলক মনোভাব পোষণ করে থাকেন; যা কখনও কখনও আত্মঘাতমূলক হয়ে থাকে। বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রেও দেখা যায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের অধীনে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এক ধরনের পক্ষপাত দেখায়; যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে দুর্নীতি। এই কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে দুর্নীতির একটা যোগসাজশ হয়ে থাকে।
সব সময় দুর্নীতিই পক্ষপাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা নয়। ব্যক্তির মানসিক গঠনও এর জন্য দায়ী। পরিবারে সম্পত্তির বণ্টন এবং ভোগের বিষয়েও সবচেয়ে ক্ষমতাবান লোকটি ভূমিকা পালন করে থাকে। সেখানেও পক্ষপাতিত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কর্তৃত্ববাদ। যারা অত্যন্ত দেশপ্রেমিক এবং মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত প্রাণ, তারাও এক সময় এই কর্তৃত্ববাদের ভূতে আক্রান্ত হয়; যার একটা প্রধান বড় উদাহরণ হচ্ছে কমিউনিস্ট শাসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান সারাবিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে একটা বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভেতরে ভেতরে সেখানেও এমনভাবে কর্তৃত্ববাদ বাসা বেঁধেছিল যে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে ক্রমেই সে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের পাশাপাশি জনগণতান্ত্রিক একটা সংগ্রামও চলতে থাকে। এই সংগ্রাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রকাশ্য। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত এসব দলের প্রভূত আত্মত্যাগের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও সেখানে কর্তৃত্ববাদ কখনও মুখ্য ভূমিকায় চলে আসে। রাজনৈতিক দর্শন সেখানে কখনও গৌণ হয়ে পড়ে। তার স্থান দখল করে উচ্চাভিলাষ এবং দখল করার প্রবণতা। একটা সময় দেখা যায়, এই প্রবণতা থেকে দলগুলোতে বিভাজন আসে এবং রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি খুব সহজেই এই দেশপ্রেমিকদের বিনাশ করতে সক্ষম হয়। যাকে আমরা সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলি, তার সঙ্গে যুক্ত পুঁজিবাদ। যেখানে ক্ষমতা মানেই অর্থ। অতএব গণতন্ত্র কার্যত হয়ে দাঁড়ায় বিত্তহীন মানুষদের ওপর বিত্তবানদের শাসন।
আরেকটি বড় প্রভাব মানুষকে সংকুচিত করে দেয়, তা হলো ভয়। কর্তৃত্ববাদ মানুষের মধ্যে এমন ভয় সঞ্চারিত করে যে, সে অবদমন করতে শেখে। সঠিক কথাটি বলতে সে দ্বিধায় পড়ে যায়। এ দ্বিধা কারও সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে পড়ে। তাই অধিকাংশ মানুষ একটা সময় পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদকে মেনে নেয়। আবার কর্তৃত্ববাদের রোগে আক্রান্ত রাষ্ট্র পরিচালকরা একপর্যায়ে নিজেদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করে। এই বিভাজন যখন স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন মানুষের অবদমিত এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
এদিকে একই ব্যবস্থায় জন্ম ও পরিপুষ্ট বলে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের মধ্যেও ক্ষমতার মোহ জাগে। সুযোগ-সুবিধা আর অর্থের ধান্দা করতে গিয়ে তারাও কর্তৃত্ববাদের খপ্পরে পড়ে। এখন বস্তুত কোনো রাষ্ট্রই শুধু নিজের ক্ষমতায় চলে না। নানা বড়-ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বাঁধতে হয় তাকে, যেখানে নেতৃত্বে থাকে কোনো না কোনো পরাশক্তি। এই পরাশক্তিগুলো অধিকাংশ সময় গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে নানা প্রক্রিয়ায় নিজেদের অধীন করে নেয়। এখানেও বিপুল অর্থ এবং ক্ষমতার লেনদেন হয়ে থাকে।
পৃথিবীতে চিরকালই অর্থ কর্তৃত্ববাদের একটি হাতিয়ার। আর দরিদ্রপ্রধান দেশে আর্থিক সংকট এক চিরকালের সমস্যা। খুব অল্প অর্থেই মানুষের কেনাবেচা হয়ে যায়। আজকের দিনে যে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে খুব কম ক্ষেত্রেই যোগ্য প্রতিনিধি জয়ী হতে পারে। নির্বাচন আপাতদৃষ্টে সুষ্ঠু হলেও অর্থের কর্তৃত্ব সেখানে মূল ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের মতো দেশের সংসদগুলো ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ব্যবসায়ীদের হীন স্বার্থ দেখতে গিয়ে সরকার মূল্যস্ফীতি রোধ করতে পারে না বা চেষ্টাও করে না। অন্যদিকে মানুষের ওপর অযৌক্তিক কর চাপিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে মানুষ এক শ্বাসরুদ্ধকর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।

সম্প্রতি শুধু যে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে তা নয়, আরও বহুবিধ সংকট লক্ষ্য করা যায়। যেমন–গ্যাসের স্বল্পতা জনজীবনে এক বড় সংকট তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে চলছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং। ওষুধের মতো মানবিক বিষয়টিও এর বাইরে থাকছে না। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি না করে সেগুলো অসম শর্তে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা না করে গোটা সরবরাহ ব্যবস্থা আমদানিনির্ভর করে ফেলা হচ্ছে। করোনা মহামারিতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান টিকা আমদানির ক্ষেত্রে বিপুল মুনাফার দিকেই নজর দিয়েছিল এবং দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করে বিদেশি প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করেছিল।
এ কারণেই বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উৎসাহ একেবারেই কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের ছাত্ররা কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে বিদেশে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক সংস্থায় জীবিকা নির্বাহ করছে। অদূরভবিষ্যতে বিজ্ঞানে উৎসাহী ছাত্রদেরও আর খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন সাহিত্য বা মানবিক বিষয়ে অধ্যয়ন করতে উৎসাহী নয়। তারা ব্যবসা সম্পর্কিত পড়াশোনায় উৎসাহী, যদিও কর্মক্ষেত্র এখানেও সংকুচিত। তাই তারাও অভিবাসনপ্রত্যাশী।
কর্তৃত্ববাদ মানুষের আদিম প্রবণতা। কিন্তু শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং গণমুখী রাজনীতি–মানুষের এই ভয়ংকর প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে তাদের মানবিক করে তোলে। এ প্রক্রিয়ায় কর্তৃত্ববাদসৃষ্ট ভয়কেও অতিক্রম করা যায়। ফলস্বরূপ, মানুষ হয় প্রতিবাদী ও গণমুখী; রাষ্ট্রকেও তা মানবিক
করে তোলে।
মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
- গণঅভ্যুত্থান