নেপালের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের অগ্নিপরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
দীনেশ কাফলে
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:২১ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২১
এক সপ্তাহের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পর নেপালের মধেশ অঞ্চল অবশেষে শান্ত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংকট ব্যবস্থাপনা কৌশলের ফলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মত হয়েছেন। যদিও কিছুটা দেরিতে, তবুও এই অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক উদ্যোগ একটি জবাবদিহি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। তবে কেবল তাৎক্ষণিক বা অস্থায়ী পদক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতার আগুন পুরোপুরি নেভে না। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমিয়ে আনতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ঘটনার গোড়ার সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজতে হবে– যার শুরুটা হতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা থেকেই।
প্রথমত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়কালটি লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, মধেশ অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করার জন্য ভেতরে ভেতরে একটি সুসংগঠিত চেষ্টা চলছে। অবশ্যই এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল সুনসারির কাপ্তানগঞ্জে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের কিছু পুরুষের শক্তিমত্তা দেখানোর মধ্য দিয়ে। বল বাম শোভাযাত্রার হিন্দু ভক্তরা রাতে উচ্চ শব্দে ধর্মীয় গান বাজাচ্ছিলেন এবং স্থানীয় মুসলিম যুবকেরা তাদের থামাতে চেষ্টা করেন। এরপরই অতি-উৎসাহী পুলিশের লাঠিচার্জের কারণে এই স্থানীয় বচসা প্রদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রূপ নেয়।
জাতীয় পর্যায়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা চলছে, আর ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধীদের হস্তক্ষেপ করার জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। এর লক্ষণগুলো এরই মধ্যে স্পষ্ট। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ক্রমাগত দরকষাকষি করছেন, যেখানে তাদের প্রধান দাবিই হলো ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ফিরিয়ে আনা। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই দাবিটি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং আপাতত বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এই আলোচনাগুলো কেবল একতরফা সাম্প্রদায়িক সন্দেহকেই জোরদার করার দিকে গেছে, যার মধ্যে মাদ্রাসাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি অন্যতম।
হ্যাঁ, মাদ্রাসাগুলোর ওপর নজরদারি চালান, তবে পাশাপাশি মন্দিরগুলোতেও চালান। গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহে দেখায় যে, সাম্প্রদায়িকতা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র বলয়ে আবদ্ধ নয়। বরং আমরা খুব দ্রুত প্ররোচিত হই এবং অন্যকে প্ররোচিত করি। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা হয় সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ভিডিও ছড়ানোর জন্য; আর ধর্মীয় শোভাযাত্রার পথ পরিবর্তন করা হয় অন্য সম্প্রদায়ের গ্রাম দিয়ে নিয়ে গিয়ে তাদের খ্যাপানোর জন্য। বাঁকে, ধনুষা এবং সারলাহিতেও অতীতে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে, যা এই ধারণাকেই জোরালো করে যে পুরো মধেশজুড়েই একই ধরনের সাম্প্রদায়িকতার পাঠ দেওয়া হচ্ছে। কোনো একটি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা এমন মৌখিক বা শারীরিক কাজ করে, যা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে, তার পরপরই শুরু হয় সেই ঘটনাগুলোর রাজনীতিকীকরণ।
সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর তথ্যমতে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে ২৫টি ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘর্ষের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। কিন্তু মধেশি অধ্যুষিত অঞ্চলের এই সাম্প্রদায়িক উস্কানির পেছনে মূল কারিগর কারা? একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সীমান্তবর্তী শহরগুলো থেকে ভেসে আসা সাম্প্রদায়িকতার ঢেউ। রাজনীতিচালিত এই ধর্মীয় মেরূকরণ ঠেকাতে উন্মুক্ত সীমান্ত একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ, যা ভারতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেই পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন পরিসর সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ ১২ বছর ধরে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) সমর্থিত বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চলছে। এটি রাজনৈতিকভাবে দলটিকে বেশ লাভবান করেছে। ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ (হিন্দুরা ঝুঁকিতে আছে)– এটিই বিজেপির সবচেয়ে ধারাবাহিক রাজনৈতিক স্লোগান, যারা তাদের সুবিধামতো যে কোনো জায়গায় পুরো একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ শব্দটি জুড়ে দিতে পছন্দ করে।
এর জন্য আপনার সব সময় নিজস্ব দলীয় ক্যাডার দিয়ে মাঠ পর্যায়ের কাজ করানোর প্রয়োজন পড়ে না। আরএসএসের হিন্দুত্ববাদের ধারা ডিজিটাল মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। নেপালিরাও এখন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ‘জয় সিয়া রাম’ স্লোগানের পরিবর্তে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে মধেশের রাজপথে ধর্মের এই রাজনীতিকীকরণ নেপালে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে হিন্দুধর্মের প্রত্যাবর্তনের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করতে সাহায্য করেছে। একবার রাজনীতির পথ সুগম হলে এবং সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ বুনন ছিঁড়ে গেলে, সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন, এমনকি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে আমাদের ফিরে আসতেই হবে। কিন্তু কীভাবে?
এবারের সাম্প্রদায়িক সংকট আমাদের সেই অফিসিয়াল বা ওপর ওপর ধর্মনিরপেক্ষতার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা আমরা বিশ বছর আগে নেপাল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি হিসেবে তাড়াহুড়ো করে গ্রহণ করেছিলাম। এখন আবার গোড়া থেকে শুরু করার সময় এসেছে এবং এটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে লুকিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া কোনো বিদেশি ধারণা নয়, বরং এটি একটি বোধ এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা। কেবল তখনই ধর্মনিরপেক্ষতা তার আসল অর্থ ও গ্রহণযোগ্যতা খুঁজে পাবে, যখন এটি আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে।
দিনেশ কাফলে: কাঠমান্ডু ইউনিভার্সিটি স্কুল অব আর্টসে অধ্যাপনা করেন; দ্য কাঠমুন্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম।
- বিষয় :
- নেপাল
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা