ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

শিক্ষার্থীদের ‘ডিজিটাল বন্ধু’ এবং সতর্কতা

শিক্ষার্থীদের ‘ডিজিটাল বন্ধু’ এবং সতর্কতা
×

মাহবুবুর রাজ্জাক

মাহবুবুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০০

সমাজ-সংসারে সঠিক পথে চলার জন্য মানুষের তথ্যের প্রয়োজন। তথ্য আদান-প্রদান এবং ভালোমন্দ পরামর্শ করা যায়, এমন বন্ধু বা সঙ্গীর দরকার হয়। দিন দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেন মানুষের নিত্যদিনের কাজের সঙ্গী হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ‘ডিজিটাল বন্ধু’ হিসেবে যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। লেখাপড়ার কাজে, অর্থাৎ শিক্ষায় এআই ব্যক্তিগত শিক্ষক বা শেখার বন্ধু হিসেবে কাজ করতে পারে। কোনো বিষয় ঠিকমতো বোঝা না গেলে এআই-কে জিজ্ঞেস করা যায়। অনুশীলনীর সমস্যাগুলোর সমাধান করা যাচ্ছে না? এআইর সাহায্য নেওয়া যায়। কোন অধ্যায় থেকে কী কী ধরনের প্রশ্ন হতে পারে, আর তাদের উত্তর কেমন হবে, এআইর সাহায্যে জেনে নেওয়া যায়। উত্তরে কোনো ভুল আছে কিনা– পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া যায়। 

ঘরের কাজে এআই ব্যবহার করে ঘরের আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বাড়ির নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বাজারের তালিকা তৈরি কিংবা দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য ইমেইল লেখা, তথ্য খুঁজে বের করা, কোনো বিষয়ের ওপর প্রতিবেদন তৈরি, ডেটা বিশ্লেষণ, মিটিংয়ের সারাংশ তৈরি– এসব কাজে এআইর সহায়তা নিয়ে অল্প সময়ে অনেক কাজ করা সম্ভব। যাতায়াতের সময় পথ নির্ধারণ নিয়ে আমরা প্রায়ই দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকি। একসময় এআই দিয়ে ট্রাফিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দ্রুততম পথ নির্বাচনে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। কোনো কিছু কেনাকাটার সময় এআই মানুষের প্রয়োজন ও পছন্দ বুঝে পণ্য খুঁজে দেবে এবং ব্যক্তিগত বাজেট অনুযায়ী পরামর্শ দিতে সক্ষম হবে।

এখনকার ডিজিটাল যুগে আমরা কম্পিউটারকে কোনো কাজ নির্দিষ্ট করে করতে দিই এবং কম্পিউটার আমাদের নির্দেশনামতো সেই কাজ সম্পাদন করে। এআই-কে সুনির্দিষ্ট আদেশ দিতে হয় না; তার সঙ্গে পরামর্শ করা যায়। ভবিষ্যতে আমরা এআই-বন্ধুকে বলতে পারব– আমার আগামী সপ্তাহের কাজগুলো গুছিয়ে দাও এবং কোন কাজ আগে করা উচিত সে সম্পর্কে পরামর্শ দাও। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে এআই হবে ব্যক্তিগত ডিজিটাল সহকারীর মতো। ভবিষ্যতের মানুষ এআই-কে ব্যবহার করবে কাজ আরও ভালোভাবে করা ও কাজের গতি বৃদ্ধির জন্য। 

এ কারণেই শিক্ষার্থীদের এআইর সঙ্গে পরিচিত করে তোলা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিজ্ঞান ও দৈনন্দিন জীবনে এআইর প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই এআই কী; কীভাবে কাজ করে; কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং এর সীমাবদ্ধতা কী– এসব সম্পর্কে সবারই প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি। 

ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হবে এআই ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ আর এআই ব্যবহার করতে পারে না এমন মানুষের মধ্যে। এতদিন কম্পিউটারের ব্যবহার জানা ছিল চাকরি পাওয়ার জন্য একটি বাড়তি সুবিধা। এখন এআই ব্যবহার করতে জানা ধীরে ধীরে কর্মজীবনের মৌলিক দক্ষতায় পরিণত হচ্ছে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বয়স উপযোগী এআই শিক্ষা শুরু করা গেলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে শুধু এআই ব্যবহারকারী নয়, বরং এআই-নির্ভর অর্থনীতিতে সৃজনশীল ও দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হবে।

ছোটবেলা থেকেই যদি এআই সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকে তবে শিশুরা বুঝতে পারবে, এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানবে যে, এআইর ফলাফল সব সময় সঠিক নয়। এআই ভুল তথ্য দিতে পারে। তাই এআইর উত্তর যাচাই, তথ্যের উৎস পরীক্ষা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জিত হবে। এআই ব্যবহার করে উত্তর পাওয়া খুব সহজ। তাই এআই কী উত্তর দিল, সেটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দেখতে শেখাতে হবে। উত্তরটি সঠিক কিনা এবং সঠিক হলে কেন সঠিক, তা নিশ্চিত না হয়ে গ্রহণ করা উচিত নয়– এটি শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে। 

এআই ব্যবহার করে সৃজনশীল ও পর্যালোচনামূলক কাজের চর্চা বাড়লে শিশুরা ধীরে ধীরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পরিত্যাগ করে চিন্তাশীল শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। যেমন এআই দিয়ে গল্প লেখা; ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, প্রজেক্ট তৈরি করা যায়। তবে সৃজনশীলতা বাড়াতে শিশুকে এআইর ওপর নির্ভরশীল না করে নিজের চিন্তার সঙ্গে এআই-কে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে শেখানো উচিত। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করি। বন্ধুর ওপর নির্ভরশীলতাও নিয়ন্ত্রণ করি। একইভাবে শিশুদের এআই শিক্ষায়ও অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এআই-কে জিজ্ঞেস করার অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়। শিশুদের নিজে পড়া, পর্যবেক্ষণ করা, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং শিক্ষককে প্রশ্ন করা– এসব কার্যক্রম চালু রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করা উচিত। 

এআই শেখানোর নামে শিশুকে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটারের সামনে রাখা উচিত নয়। নির্দিষ্ট সময় ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে এআই ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। ডিজিটাল জগতের ন্যায়-অন্যায় এবং দায়িত্বশীলতার মতো বিষয়গুলো নিয়েও তাদের ধারণা দেওয়া উচিত। এআইর ব্যবহার শেখার সঙ্গে সঙ্গেই শেখাতে হবে, অন্যের লেখা নিজের লেখা বলে চালিয়ে দেওয়া অথবা অন্যের ছবি বা তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা অন্যায়। এআই দিয়ে কাউকে অপমান, প্রতারণা বা হয়রানি করা অপরাধ। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সময় শিক্ষক ও অভিভাবকের সক্রিয় তত্ত্বাবধান থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

আরও পড়ুন

×