সিডও দিবস
নারী-সহিংসতার চক্র ভাঙবে কে?
মোনছেফা তৃপ্তি
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ৩ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সিডও দিবস। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয়। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আমরা প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। একজন অপরাধী, একজন ভুক্তভোগী, একটি অপরাধ, তারপর একটি মামলা। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি সহিংসতার পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে না।
নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে একটি চক্র বা পুনরুৎপাদনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা জরুরি। এই চক্রের একটি সম্ভাব্য কাঠামো হলো–
কাঠামোগত বৈষম্য → ক্ষমতার অসমতা → সহিংসতার ঝুঁকি → সহিংসতা → নীরবতা ও ভুক্তভোগীকে দোষারোপ → অভিযোগ ও প্রতিকারে বাধা → দুর্বল/বিলম্বিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার → বিচারহীনতা ও দায়মুক্তি → সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ → পুনরায় বৈষম্য ও ক্ষমতার অসমতা। এই চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একবার ঘুরে থেমে যায় না। একটি ধাপ পরের ধাপের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
১. কাঠামোগত বৈষম্য
চক্রের শুরুতেই থাকে এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, যা নারী ও শিশুকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রাখে। শিক্ষায় অসম সুযোগ, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, সম্পত্তিতে সীমিত অধিকার, অবৈতনিক গৃহশ্রমের স্বীকৃতির অভাব, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, যৌতুক কিংবা নারীর চলাফেরা ও সিদ্ধান্তের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ– এসব সবসময় সরাসরি সহিংসতা নয়। কিন্তু এগুলো নারী ও শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।
২. ক্ষমতার অসমতা
বৈষম্য যখন দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ষমতার অসমতায় রূপ নেয়। কে অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবে? কে সিদ্ধান্ত নেবে? কে সম্পর্ক থেকে বের হতে পারবে? কে প্রতিবাদ করলে তার কথা বিশ্বাস করা হবে? যখন এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে এক পক্ষের হাতে থাকে, তখন সহিংসতার জন্য একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। নারীবাদী তত্ত্বমতে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে না দেখে বৃহত্তর লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখতে হয়।
৩. সহিংসতার ঝুঁকি থেকে সহিংসতা
ক্ষমতার অসমতা নিজে সবসময় সহিংসতায় পরিণত হয় না। কিন্তু যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা, আগ্রাসন, বৈষম্যমূলক নারী-পুরুষভিত্তিক আচার এবং দায়মুক্তির ধারণা, তখন ঝুঁকি বাড়ে।
৪. নীরবতা ও ভিকটিম ব্লেমিং
সহিংসতার পর চক্রটি থেমে যায় না; বরং আরও শক্তিশালী হয়। পরিবারের সম্মান, সামাজিক অপবাদ, বিয়ের ভবিষ্যৎ, চাকরি হারানোর ভয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কিংবা অভিযুক্তের প্রভাব– সবকিছু ভুক্তভোগীকে নীরব রাখতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভিকটিম ব্লেমিং। ‘সে সেখানে কেন গিয়েছিল?’, ‘এমন পোশাক পরেছিল কেন?’, ‘ছবিটি তুলেছিল কেন?’ এভাবে অপরাধীর দায় থেকে মনোযোগ সরিয়ে ভুক্তভোগীর আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
৫. অভিযোগ ও প্রতিকারে বাধা
নীরবতা ভাঙতে পারলেও বিচার পাওয়ার পথ সহজ নয়। থানায় অভিযোগ করতে ভয়; মামলা পরিচালনার খরচ; পরিবারের বিরোধিতা; আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা; অভিযুক্তের প্রভাব কিংবা সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা অভিযোগের পথে বাধা তৈরি করে।
৬. দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে বিচারহীনতা
অভিযোগের পর আসে রাষ্ট্রীয় প্রতিকার। তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা, প্রসিকিউশন, আদালতের সময়, সাক্ষী সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের আচরণ– প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা কিংবা বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকা শেষ পর্যন্ত তৈরি করে দায়মুক্তির সংস্কৃতি। অপরাধী বোঝে– আইনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। আর ভুক্তভোগী মেনেই নেয়– অভিযোগ করেও হয়তো বিচার পাওয়া যাবে না।
৭. স্বাভাবিকীকরণ চক্র আবার শুরু
দায়মুক্তির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সমাজেও পড়ে। ‘এসব তো হয়ই’; ‘মেয়েদের সাবধানে চলতে হবে’; ‘মামলা করে কী লাভ?’– এ ধরনের মন্তব্য ধীরে ধীরে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। অপরাধীর দায় কমে যায় ও ভুক্তভোগীর ওপর দায়িত্ব বাড়ে। সহিংসতা তখন অস্বাভাবিক ঘটনা না থেকে দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে।
প্রযুক্তির কারণে সহিংসতার ধরন বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো বদলায়নি। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অনলাইন হুমকি, যৌন হয়রানি, সাইবার স্টকিং ও ব্ল্যাকমেইল– এসব এখন নারীদের নিয়ন্ত্রণ ও নীরব করার নতুন উপায়।
কথা একটাই– চক্রটি ভাঙতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সহিংসতার এই চক্র ভাঙবে কে? পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। তবে নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই শেষ প্রশ্নটি রাষ্ট্রের কাছেই– কবে এই চক্র ভাঙার দায়িত্ব কার্যকরভাবে নেওয়া হবে?
মোনছেফা তৃপ্তি: পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- দিবস