ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আর্সেনিক: আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে হাজারো মানুষের

চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আর্সেনিক: আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে হাজারো মানুষের
×

মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৫:৪৫ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৫:৪৫

আর্সেনিকের অভিশাপ ছেঁয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। এসব গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হাজার হাজার মানুষ। প্রাণ গেছে প্রায় এক হাজার। শুধু আর্সেনিক নয়, অতিরিক্ত মাত্রায় আয়রন ও মেটালযুক্ত অনিরাপদ পানি পানে দেখা দিচ্ছে নানা রোগ। শরীরে দেখা দিয়েছে আর্সেনিকজনিত বিভিন্ন ধরণের জটিলতা। আর্সেনিকযুক্ত ও অনিরাপদ পানি পান করে আর্সেনিকসিস ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরণের রোগে ভুগে মারা গেছেন অনেকেই। অনেকে হারিয়েছেন একটি প্রজন্ম। কেউ আবার হারিয়েছেন নিকটজনদের। তবুও যুগের পর যুগ মেলেনি কোনো প্রতিকার।

স্থানীয়রা বলছেন, বেশ কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে স্থাপন করা হয় কিছু নলকূপ। এখন তা অকেজো হয়ে পড়েছে। সমস্যা সমাধানে নতুন করে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। বেসরকারিভাবে কিছু গ্রামে পানির ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় আর্সেনিকে আক্রান্ত কোনো রোগী নেই। জেলায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শূণ্য দেখিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে প্রতিবেদন। তবে, বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। যদিও বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে গোপিনাথপুর গ্রাম পরিদর্শন করেছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলার গোপিনাথপুর, বড় দুধপাতিলা, সদর উপজেলার ডিহি, কৃষ্ণপুর, বেগমপুরসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় আর্সেনিকের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।  গত ৩০ বছর ধরে আর্সেনিকের তীব্র যন্ত্রণায় কাতর এসব এলাকার মানুষ। জেলার বিভিন্ন গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী কয়েক হাজার। মারা গেছেন প্রায় ১ হাজার মানুষ। এরমধ্যে দামুড়হুদা উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের অবস্থা অবর্ণনীয়। এই গ্রামের প্রতিটি পরিবারই আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। গত ২০ বছরে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে কয়েক শত মানুষের। একই গ্রামের আব্দুল আলিমের পরিবারে ৫ জন, জাহিতন নেছার পরিবারের ৫ জন, সবেদ আলীর পরিবারে ৪ জন ও হালিমা খাতুনের পরিবারের ২ জন মারা গেছেন আর্সেনিক বিষক্রিয়ায়। অঙ্গহানি হয়েছে অনেকের। নিকটজন হারিয়ে শোকে পাথর হয়েছে স্বজন, শুকিয়েছে তাদের চোখের পানি। তবুও কাটেনি অভিশাপ। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও নিরুপায় হয়ে সেই বিষই পান করছেন সবাই। যুগের পর যুগ আর্সেনিকের এমন প্রকোপে ঘুম ভাঙেনি কারও। এ যেন যুগে যুগে টিকে থাকা মহামারি।

গোপিনাথপুর গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৩০ বছর ধরে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছি। হাতের তালু ও পায়ে তলায় সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত। যন্ত্রণা বাড়লে কাজ করতে পারি না। দুই ছেলের আয়ে চলে সংসার। গত ২ বছর আগে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আমার স্ত্রী আর্জিনা খাতুন। এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছি।

 গোপিনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজিব হাসান বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই সুপেয় পানির সংকটে ভুগছি। আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ির টিউবওয়েলেই আর্সেনিক রয়েছে। প্রতিটি টিউবওয়েলের পানিই খাবার অযোগ্য। রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও মেটাল। ২০০২ সালে একটি বিদেশী সংস্থা আয়রনমুক্ত পানির ট্যাংক নির্মাণ করে দিলেও এখন তা প্রায় অকেজো, অপরিস্কার। এখান থেকে পানি নিতে নিত্যদিন লড়াই করেন এখানকার বাসিন্দারা। এক ফোঁটা কিন্তু এই পানিই বা কতটুকু নিরাপদ? তা আমরা জানি না। এভাবেই যুগের পর যুগ চলে গেছে। সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

গোপিনাথপুর গ্রামের শতবর্ষী জাহিতন নেছা বলেন, আর্সেনিকযুক্ত অনিরাপদ পানি পানে একে একে মৃত্যু হয়েছে আমার পরিবারের ৫ জনের। এখন বাকী সদস্যদের নিয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা। গ্রামের একটি পুরোনো ট্যাংক থেকে পানি নিতে সকাল সকাল বের হতে হয়। কারণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন দাঁড়িয়ে নিতে হয় পানি।

বড় দুধপাতিলা গ্রামের বাসিন্দা ছালিমা খাতুন বলেন, এই গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আর্সেনিকে আক্রান্ত। মৃত্যুও হয়েছে কয়েক শত। এই গ্রামের শুধু কার্ডধারী রোগীই রয়েছে ১ হাজার ৪শ। এই গ্রামে এনজিও থেকে একটি ট্যাংক করে দিয়েছে। সেটি আমরা সবাই মিলে চালাই। অনাগত সন্তান নিয়ে আতঙ্কে গর্ভবতী মেয়েরাও। টিউবওয়েলের পানিই যেন আমাদের জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় ১ যুগ আগে জেলায় আর্সেনিক নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা রিসো। রিসোর নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা যে সময় আর্সেনিক নিয়ে কাজ করেছিলাম তখনই জেলায় ৫০ ভাগ গ্রামের টিউবওয়েলের পানিতেই মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। আমরা কিছু গ্রামে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারিভাবে বৃহৎ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে। 

জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে সরকারিভাবে আর্সেনিকের উপর একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপের রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭.৭৩ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেই জরিপে জেলায় ৮০ থেকে ১০০ ভাগ আর্সেনিকে আক্রান্ত গ্রামের সংখ্যা ছিলো ২৯টি। ৫০ ভাগ আক্রান্ত গ্রাম ছিল ১৭৫টি। ওই সময় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছিল ৬০৫ জন।

জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০০৩ সালের পর আর কোনো জরিপ হয়নি। বর্তমানে জেলার কিছু এলাকায় ৫০ ভাগ টিউবওয়েলের পানিতেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি। প্রকল্প না থাকায় গণহারে টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক শনাক্তের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প না থাকায় বড় পরিসরে নিরসন করা যাচ্ছে না নিরাপদ পানির সংকট। প্রকল্প চালু হলে সমস্যা কিছুটা সমাধানের আশ্বাস এই কর্মকর্তার।

এদিকে, আর্সেনিকে আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি দল।  চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীদের খোঁজখবর নেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। এসব এলাকায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়।

এসময় চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগে একটি প্রকল্প ছিল। সেসময় প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হতো। বর্তমানে প্রকল্প না থাকায় মাঠ পর্যায়ে আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও হেভি মেটালযুক্ত পানি পানে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। হতে পারে হেপাটাইটিস ও কিডনিজনিত নানা রোগ।

তিনি আরও বলেন, গোপিনাথপুর গ্রামের মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের কারণে তাদের শরীরে আর্সেনিকজনিত বিভিন্ন ধরণের জটিলতা দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে আর্সেনিকসিস ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরণের রোগে ভুগে মারা গেছেন। বিষয়টি দুঃখজনক। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করে এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি আশু জরুরী। যেখানে বিশুদ্ধ পানি রয়েছে সেখান থেকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়। সেই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করা হবে। এই গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা যায় কি না? সেটি আমরা দেখবো। আমরা পরিকল্পনা করেছি মেডিকেল ক্যাম্প করে যারা আক্রান্ত তাদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো।

এসময় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি দলের সদস্য চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আওলিয়ার রহমান ও সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. সাজিদ হাসান উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×