ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নবম জাতীয় বেতন কাঠামো

মূল্যস্ফীতি না কমিলে দুই কূলই যাইবে

মূল্যস্ফীতি না কমিলে দুই কূলই যাইবে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি চাকুরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে আমরা সতর্কতার সহিত স্বাগত জানাই। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত নূতন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনও চলতি সপ্তাহে প্রকাশ হইবে বলিয়া জানা গিয়াছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের তথ্যমতে, বেতন কাঠামোর সর্বোচ্চ ধাপ প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত বেতন ৭৮ সহস্র হইতে এক লক্ষ ৫৬ সহস্র টাকায় উন্নীত করা হইয়াছে। অন্যদিকে বেতন কাঠামোর সর্বনিম্ন ধাপ ২০তম গ্রেডে বর্তমান মূল বেতন আট সহস্র ২৫০ হইতে ২০ সহস্র টাকায় উন্নীত হইতেছে।

দৃশ্যত, শতাংশের ভিত্তিতে বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিম্ন ধাপের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হইয়াছে, যাহা ইতিবাচক। উপরন্তু অবসরপ্রাপ্ত নিম্ন ধাপের কর্মচারীদের জন্যও সরকার অনুরূপ চিন্তা করিয়াছে। ইহার ফলে মাসে ৯ সহস্র টাকা বা উহার কম নিট পেনশনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইবে। অন্যদিকে ৪০ সহস্রের অধিক নিট পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়িবে। নূতন বেতন কাঠামোয় প্রথমবারের ন্যায় সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে তিন সহস্র টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্তও সাধুবাদযোগ্য। তদুপরি, মোবাইল ভাতা এতদিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত চাকুরিজীবীরা পাইলেও এখন সকল গ্রেডের সরকারি কর্মচারীই পাইবেন। সরকারি চাকুরিজীবীদের অষ্টম বেতন কাঠামো ঘোষিত হইয়াছিল ২০১৫ সালে। সেই হিসাবে দীর্ঘ ১১ বৎসর পর নবম বেতন কাঠামো ঘোষিত হইতে যাইতেছে। দীর্ঘ সময়ব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির দাপটে পূর্বের বেতনে জীবনযাত্রা সচল রাখা সরকারি চাকুরিজীবীদের পক্ষে কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। সংগত কারণেই তাহাদের দিক হইতে নূতন বেতন কাঠামোর জন্য উত্তরোত্তর দাবিও উঠিতেছিল। সেই দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়াই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হইতেছে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং জনজীবনে উহার সার্বিক প্রভাব লইয়া। সরকারি সিদ্ধান্তমতে, নূতন বেতন কাঠামোর সমুদয় সুবিধা পাইতে প্রায় ২৪ লক্ষ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লক্ষাধিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর আরও অন্তত দুই বৎসর অপেক্ষা করিতে হইবে। কিন্তু তাহাতে কি উক্ত মানুষদের পক্ষে জরুরি ভিত্তিতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভবপর হইবে? ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে সরকার মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ সামাল দিবার কৌশল বলিয়া দাবি করিয়াছে। ইহাতে যুক্তি একেবারে নাই, তাহা বলা যায় না। কিন্তু চলমান মূল্যস্ফীতি যে শুধু বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে ঘটিয়াছে, তাহা অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকই মনে করেন না। এইখানে দেশি-বিদেশি আরও বহু কারণ ভূমিকা রাখিতেছে। যে জন্য দুই বৎসরাধিক কাল যাবৎ সকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করিবার ফলস্বরূপ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে খেসারত দিতে হইলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামিয়া আসিতেছে না।

সারকথা হইল, তিন ধাপে বাস্তবায়ন করিবার কারণে যদি শেষাবধি মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আবার সরকারি চাকুরিজীবীরাও উক্ত বেতন কাঠামোর সুফল না পান, তাহা হইলে সকলই গরল ভেল! কারণ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িলে, এমনকি বিদ্যমান হারে স্থির থাকিলেও সরকারি চাকুরিজীবীদের বাহিরে যেই কোটি কোটি সাধারণ মানুষ রহিয়াছেন তাহাদের জীবন অধিকতর দুর্বিষহ হইবে। এই সকল বিষয় বিবেচনায় লইয়া সরকার বরং আলোচ্য বেতন-ভাতা উহার ভোক্তাদের হস্তে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সময়সীমা হ্রাস করিতে পারে। তৎসহিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য কারণ দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ লইতে পারে। তাহা হইলে সকল কূলই রক্ষা হইবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।

আরও পড়ুন

×