ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

জলবায়ু সীমানা চেনে না

জলবায়ু সীমানা চেনে না
×

শশী থারুর

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিপর্যয়টি হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর ও পরস্পর নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্রের বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দিল। সীমান্ত-সংলগ্ন উঁচু পর্বতের ওপর হঠাৎ বরফ ও পাথর ধসে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এক ভয়াল রূপ দেখা দেয়। সেই প্লাবন নদীতীরবর্তী লোকালয় ভাসিয়ে নিয়ে যায়; গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয় এবং এক হাজারের বেশি প্রাণ কেড়ে নেয়। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও বৈশ্বিক অনেক পর্যবেক্ষকের মতো পূর্বনির্ধারিত কাজে আমিও তখন কাঠমান্ডুতে অবস্থান করছিলাম। ট্র্যাজেডির সেই ধাক্কা সেখানে মুহূর্তেই অনুভূত হলো।
রাজধানী কাঠমান্ডুতে ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলের আয়োজনে চলা উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা সভায় এই মর্মান্তিক ঘটনা পুরো কর্মসূচির প্রেক্ষাপটই বদলে দিল।

শ্রোতাদের উদ্দেশে বক্তব্যকালে নেপালের শাসক দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’র নেতা রবি লামিছানে মানক কূটনৈতিক বুলির ঊর্ধ্বে গিয়ে এক মর্মস্পর্শী মন্তব্য করেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরেন– ভারত, চীন ও নেপালের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সীমানা বিরোধ যা-ই থাকুক না কেন; এই তিন দেশ একই পর্বতমালা ভাগ করে টিকে রয়েছে। 

তাঁর এই বক্তব্য কাঠমান্ডুজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক গভীর অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন স্থানীয় দুর্ঘটনা নয়, বরং দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি ফল। এটি এক চরম নির্মম পরিহাস, নেপালের নিজস্ব গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে করুণ ও নির্মম পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে এর বিশাল ও শিল্পোন্নত প্রতিবেশীরা বিশেষ করে উত্তরের চীন বায়ুমণ্ডলের এমন উষ্ণায়নের বড় অংশীদার, যা হিমালয়ের হিমবাহ ধসের মূল কারণ।

হিমবাহ কোনো আন্তর্জাতিক সীমানা চেনে না। চেনে না কোনো হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ, নদী অববাহিকা কিংবা বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহও। যখন একটি হিমবাহজাত হ্রদের পাড় ভাঙে; ভূমিধসে আন্তঃসীমান্ত নদী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে কিংবা বরফ-পাথরের ধসে লাখ লাখ ঘনমিটার বরফ গলানো পানি নেমে এসে যে কোনো মুহূর্তে ফেটে পড়ার মতো ‘প্রতিবন্ধক হ্রদ’ তৈরি করে, তখন সেই পাহাড়ি ঢল সার্বভৌম সীমান্ত পেরিয়ে নিম্নাঞ্চলের দিকে বয়ে যায়। 

এমন অবস্থা মোকাবিলায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হলে অঞ্চলটির পরিবেশগত অভিজ্ঞতার ওপর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দরকার। হিমালয় অঞ্চলের নদীর উজানে ও ভাটিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অতীতে সহযোগিতা ছিল চরম অসম, সাময়িক প্রতিক্রিয়াশীল এবং জাতীয় নিরাপত্তার গোপনীয়তায় আবদ্ধ। 

চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তিব্বতীয় মালভূমি, যা এশিয়ার প্রধান প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎস; যার মধ্যে রয়েছে ইয়ারলুং স্যাংপো (ব্রহ্মপুত্র), সিন্ধু এবং গঙ্গার ওপরের অংশের উপনদী ভোতে কোশি ও কার্নালি। বহু বছর ধরে বর্ষাকালে হাইড্রোলজিক্যাল বা পানিবিষয়ক তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে বেইজিং স্বতঃস্ফূর্ত ও উন্মুক্ত তথ্যের নীতি না মেনে মূলত শর্তসাপেক্ষ ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের ওপর নির্ভর করে আসছে। এর ফলে সংকটের মুহূর্তে ভাটির দেশগুলোকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
একটি ত্রিপক্ষীয় পরিবেশগত ব্যবস্থা যদি অতীতের ভুলগুলো কাটিয়ে সফল করতে হয়, তবে একে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ কারিগরি ও জীবন রক্ষাকারী তাগিদ থেকে পরিচালনা করতে হবে।

প্রথমত, তথ্য আদান-প্রদানকে রাজনৈতিক ইচ্ছানির্ভর সৌজন্য থেকে একটি স্বয়ংক্রিয়, রিয়েল-টাইম প্রটোকলে রূপান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচ্ছিন্ন জাতীয় মূল্যায়নের পরিবর্তে যৌথ পরিবেশগত গবেষণা ও ঝুঁকি চিহ্নিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাস্তবতার ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে। 
 
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর 
ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×