ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

নীরব মহামারি রোধে নিশ্চুপ থাকা যাবে না

নীরব মহামারি রোধে নিশ্চুপ থাকা যাবে না
×

কামাল চৌধুরী

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে আত্মহত্যা ক্রমেই নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা করেছেন। অন্য কথায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন নিজের জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন। সংখ্যাটা যথেষ্ট আশঙ্কাজনক এবং আতঙ্ক জাগানিয়া। 

আত্মহত্যা বাড়ছে কেন? কখনও কখনও সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় এবং অস্থিরতা প্রশমনে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকে না। অর্থাৎ জনগণ সমাধানের কোনো পথ পায় না। সে ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন, শিক্ষা ও চাকরিজীবনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে তা ব্যক্তিজীবনেও চলে যায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেলেই নানাবিধ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়। আত্মহত্যা সে রকমই সমস্যা। যার পেছনে লুকিয়ে আছে মানসিক অস্থিরতা, অপ্রাপ্তি, অন্তর্দ্বন্দ্ব, চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশার চাপ। 

যেমন, কোনো তরুণী অনলাইনে সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ সেই নারীকেই দায়ী করে থাকে অনেক সময়। তখন হতাশা, অসহায়ত্ব, চরম অপমানবোধ থেকে আত্মঘৃণা তৈরি হতে পারে। যার পরিণতি হয়তে আত্মহত্যা। একইভাবে কোনো তরুণও তার ওপর পরিবারের প্রত্যাশার চাপ নিতে না পেরে, কোনো স্বপ্ন পূরণে বারবার ব্যর্থতা আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আশাহীনতা ও অসহায়ত্বের বোধ, তীব্র অনিশ্চয়তা, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, নিরাপত্তার অভাব মানুষের মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে। স্বাভাবিক সহনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী, সামাজিক অস্থিরতার সময় সমাজের বাঁধন ও মূল্যবোধ ঢিলে হয়ে যায়, যা মানুষকে চরম একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। আর যখন মানুষ মনে করে, সমাজ বা রাষ্ট্র তার পাশে নেই, তখন তার মধ্যে জীবনবিমুখতা তৈরি হয়।

বিভিন্ন জরিপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৫ বছর বয়সের নিচের জনগোষ্ঠী এবং নারীরা আত্মহত্যার দৌড়ে এগিয়ে আছে। আবেগীয় পরিপক্বতা আসার আগেই রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিশোর-কিশোরী, উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী, শৈশবে ট্রমার শিকার শিশু-কিশোর, বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী, সামাজিকভাবে আশ্রয়হীনরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন। 
প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া আত্মহত্যার নীরব মহামারি প্রতিরোধে কী করা যেতে পারে? সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সে জন্য বিভিন্ন স্তরে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, আত্মহত্যা শুধু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যাও। যারা বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার চিন্তা করছেন তারা অপরাধী নন। তারা গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছেন, যার চিকিৎসা দরকার। এই সচেতনতা নীতিনির্ধারণী ও জনসাধারণ পর্যায়ে আসতে হবে। আরেকটি ভুল ধারণা হচ্ছে, আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনা করলে এর হার বেড়ে যেতে পারে। বাস্তবে বরং চুপ থাকলেই নীরবে আত্মহত্যার হার বাড়তে থাকবে। বিভিন্ন গবেষণা তা-ই বলছে। 

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক কেন্দ্র উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল। দেশের সবকটি উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন কেন্দ্র বা আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে গ্রামীণ পর্যায়ে পরিবর্তন আসবে। এই কেন্দ্রে সনদপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর দ্বারা বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে মনোসামাজিক সেবা ও কাউন্সেলিং দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিউনিটি পর্যায়ে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষিত মাঠকর্মীরা কাজ করতে পারেন, যাতে সহজে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে মনোসামাজিক সহায়তা; প্রয়োজনে মেডিকেল সাপোর্টের জন্য দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। 

এ ছাড়া আত্মহত্যা প্রতিরোধকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতির অন্তর্ভুক্ত করে ‘ন্যাশনাল সুইসাইড প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করা উচিত। আত্মহত্যার সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণে ডেটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী ও কারণগুলো চিহ্নিত এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা জরুরি। বিশেষত শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার জীবন-দক্ষতা তৈরি করতে হবে। আত্মহত্যার নীরব মহামারি প্রতিরোধে নিশ্চুপ থাকা যাবে না।
 
কামাল চৌধুরী: অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×