ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিটিসিএল কার্যালয়

সরকারি স্থাপনায় ‘সন্দেহজনক’ হত্যা

সরকারি স্থাপনায় ‘সন্দেহজনক’ হত্যা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড-বিটিসিএল কার্যালয়ে যেইভাবে চোর সন্দেহে যুবককে প্রহারে হত্যা করা হইয়াছে, উহা উদ্বেগজনক। কয়েক দিবস পূর্বেই আমরা দেখিয়াছি, ঢাকার সাভারে পুলিশের এসবি সদস্যকে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হইয়াছে। জুলাই মাসে মানবাধিকার সংগঠনগুলির প্রতিবেদনেও উঠিয়া আসিয়াছে, দেশে গণপ্রহার ও মব সহিংসতায় মৃত্যু গত বৎসরের তুলনায় বরং বৃদ্ধি পাইয়াছে। তবে তেজগাঁওয়ের ঘটনা গুরুতর এই অর্থে যে, অন্যান্য ক্ষেত্রে গণপ্রহারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকিলেও এইখানে অভিযোগ উঠিয়াছে আনসার বাহিনীর বিরুদ্ধে। 

সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড-সংলগ্ন বিটিসিএল কার্যালয়ের প্রাচীর অতিক্রম করিয়া কয়েকজন অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তাহাদের উদ্দেশ্য চুরি ভাবিয়া বিটিসিএল কর্মীরা ধাওয়া করিয়া একজনকে আটক করিলেও অন্যেরা পালাইয়া যান। আটক যুবককে বিটিসিএল ক্যাম্পের আনসার সদস্যদের নিকট সোপর্দ করিবার পর ঐ যুবক সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়েন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লইবার পর তাঁহার মৃত্যু হয়। যদিও বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রহারের দায় অস্বীকার করিয়া ছাদ ভাঙিয়া আহত হইবার কথা বলা হইয়াছে। আমরা মনে করি, বিষয়টি খতাইয়া দেখিবার অবকাশ রহিয়াছে। এই প্রশ্নও রহিয়া যায়, ছাদ ভাঙিয়া পড়িয়া যুবকটি এতটা আহত হইয়াছেন যে, উহা তাঁহাকে মৃত্যুমুখে ঠেলিয়া দিয়াছে? আনসার সদস্যগণ তাহা হইলে তাঁহাকে কেন পুলিশের নিকট হস্তান্তর করিলেন না? সংগত কারণে এই অভিযোগ উঠিয়াছে, আনসার সদস্যরাই তাঁহাকে আটকাইয়া রাখিয়া শারীরিক নির্যাতন চালাইয়াছেন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বৎসরের জানুয়ারি হইতে জুন পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতা ও গণপ্রহারের ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হইয়াছেন। অপরদিকে ২০২৫ সালের একই সময়ে নিহত হইয়াছিলেন ৬৭ জন। ইহাতে আমরা দেখিতেছি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেই বাড়বাড়ন্ত মব সহিংসতা প্রত্যক্ষ করিয়াছি; গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সময়ে আসিয়া উক্ত প্রবণতা হ্রাস না পাইয়া বরং বৃদ্ধি পাইয়াছে।

আমরা জানি, গণপ্রহার কিংবা মব সহিংসতার নেপথ্যে বিচারহীনতার সংযোগ রহিয়াছে। মানুষ তখনই আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লয়, যখন বিচারপ্রাপ্তির আশা শূন্য থাকে। অস্বীকার করা যাইবে না, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নহে। সম্প্রতি পুলিশের প্রতিবেদনেই উঠিয়া আসিয়াছে, দেশে সাত মাসে সাড়ে ১৫ সহস্রাধিক শিশু নিখোঁজ হইয়াছে। অধিকাংশ শিশুকে উদ্ধার করা হইলেও অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা হ্রাস পায় নাই। বেপরোয়া ছিনতাই, খুনসহ আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেজনক কোনো ঘটনাই থামিয়া নাই।
দেশের বিভিন্ন স্থানে চোর-ডাকাত বা অন্য কোনো সন্দেহে গণপ্রহারে হত্যার বাড়বাড়ন্ত ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করিতে হইলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করিতে হইবে। নচেৎ রাষ্ট্রে কোনো সাধারণ নাগরিকই নিরাপদ বোধ করিবেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদসহ নানামুখী সীমাবদ্ধতা ছিল। বর্তমান সরকার পাঁচ বৎসরের জন্য নির্বাচিত হইয়াছে। যদি কঠোর হস্তে অপরাধ দমন এবং বিচারপ্রাপ্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করিতে না পারে তবে উহা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

আমরা প্রত্যাশা করিব, আলোচ্য প্রাণহানির ব্যাপারে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা হইবে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও ফরেনসিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন জরুরি। এইখানে আনসার সদস্য জড়িত থাকিলে তাহাদের আইনের আওতায় আনিয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা জরুরি, যাহাতে ভবিষ্যতে কেহ অপরাধীকে বিচারের নামে নিজেরাই বিচারক হইবার দুঃসাহস প্রদর্শন না করে।

আরও পড়ুন

×