মধ্যপ্রাচ্য
ফিলিস্তিনে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানে আমাদের উদ্যোগ
অ্যান্ডি বার্নহাম
অ্যান্ডি বার্নহাম
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্ব এক জটিল ও বিপজ্জনক জায়গা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া তথা ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের এক দশক হলো। এ পরিস্থিতিতে এখনও এই ঝুঁকি বিস্তর– ব্রিটেন নেতৃত্ব দিতে এবং তার মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারবে কিনা। তবে আমি সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় অপ্রস্তুত নই। ব্রিটেনকে যেভাবেই হোক এই পথে দাঁড়াতে হবে এবং এটি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে আমরা অনেক বছর ধরেই ফিলিস্তিন সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের কথা বলে আসছি। আমরা যদি এর স্বীকৃতি না দিই; এর পক্ষে না দাঁড়াই এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করি, তবে এই সমাধানের কথা বলার কোনো মূল্য থাকে না। অথচ দীর্ঘ সময় ধরেই আমরা এমন অবস্থার মধ্যে আছি, যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত বোধ করছি। যেন আমরা এই ভয়ে ভীত যে, কিছু করলেই আমাদের ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হবে। আজ আমরা সচেতনভাবেই এ অবস্থান নিয়েছি; পরিকল্পিতভাবেই এ পদক্ষেপ ঘোষণা করছি। এও বলছি, আমাদের পদক্ষেপের নিশানা ইসরায়েলি জনগণ নয়, বরং ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের অগ্রহণযোগ্য নীতির বিরুদ্ধেই আমাদের অবস্থান।
ফিলিস্তিনের মানুষের দুঃখ-কষ্ট বিশ্বের সচেতন মানুষের জন্য এক বেদনার বিষয়। শিশুসহ নিষ্পাপ ফিলিস্তিনিরা গাজায় অব্যাহত হত্যাকাণ্ডের শিকার। সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য ত্রাণ সহযোগিতার কারণে মানবিক সংকট চলছে। ত্রাণ দিতে এবং নিতে গিয়েও বহু স্থানীয় ও বাইরের মানুষ হতাহত হয়েছেন। সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীরাও রেহাই পাননি। ইসরায়েলি সেখানকার ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এত বেশি যে, পরিস্থিতি অনুধাবন করা কঠিন। সেখানে ৭০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার শিশু। ইসরায়েলি বোমায় বহু ফিলিস্তিনির গোটা পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়েছে। গাজার পরিবার ও কমিউনিটিগুলো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত। গাজার মানুষ পুরো ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জায়গার মধ্যে গাদাগাদি করে থাকছে।
আমি জানি, ইংল্যান্ডের মানুষ এই দুর্দশায় বেদনাহত; আমিও তার বাইরে নই।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে আমি আমার এক বক্তব্যে বলেছিলাম, আমাদের দেশের প্রতিক্রিয়া খুবই ধীর এবং কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। সে কারণেই আমি সরকারের অবস্থান বদলানোর বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম।
এই ভয়াবহ কষ্ট ও দুর্দশা অসহনীয়। এটি এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে সেরা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ওপর চপেটাঘাত। আমি এই সংকট মুখ বুজে সহ্য করব না। বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের চার বছর মেয়াদে এত বসতি স্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে, যা বিগত ২০ বছরেও পায়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ বছর এ পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের ওপর সহিংস হামলা হচ্ছে; পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে এবং দ্রুতই।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ইসরায়েল সরকার ১০৪টি নতুন বসতির অনুমোদন দিয়েছে। এমনকি ইসরায়েলে অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগেই তারা ‘ই ওয়ান’ মেগা-বসতি নির্মাণের দরপত্র প্রক্রিয়ার অনুমতি দিচ্ছে। এটি পশ্চিম তীরের মূল ভূখণ্ডকে বিভক্ত করে ফেলবে। তার বুক চিরে ফেলবে। এটি দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধানের আশা একবারে ধ্বংস করে দেবে। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না।
সে জন্যই আমরা ইসরায়েলি সরকারকে চাপে ফেলতে নতুন একটি প্যাকেজ ঘোষণা করছি, যার মাধ্যমে আমরা কঠোর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে যাচ্ছি।
প্রথমত, আমরা ফিলিস্তিনে স্থাপিত অবৈধ বসতির সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন নিষিদ্ধ করব।
দ্বিতীয়ত, প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান পরিবর্তন করে বলছি, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সব দখলদারিত্ব অবৈধ। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের অবস্থানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

এবং তৃতীয়ত, আমরা সেই ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করব, যারা অবৈধ স্থাপনাকে সমর্থন করবে, সেগুলো স্থাপনে সহযোগিতা করবে কিংবা সেখান থেকে লাভবান হবে। এর মধ্যে যে কোনো ধরনের ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগও হতে পারে, যে বিনিয়োগ ‘ইওয়ান’ স্থাপনা প্রতিষ্ঠার অংশ হবে।
একই সঙ্গে আমরা গাজায় ত্রাণ তৎপরতার নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করছি, যেটি সেখানকার মানবিক প্রয়োজনে জরুরি। আমরা এসব পদক্ষেপ নিচ্ছি, কারণ আমরা মনে করি, এগুলোই সঠিক কাজ।
২০২৩ সালে ইসরায়েলের ওপর যে ভয়ানক সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, আমি তার নিন্দা জানিয়েছি। কঠোরভাবেই আমি সে অবস্থান নিয়েছি এবং এখনও হামাসের বিরুদ্ধে আমাদের নিন্দা অব্যাহত আছে। তার অর্থ এটা নয়, ইসরায়েলি সরকার গাজায় কিংবা পশ্চিম তীরে যা করছে, আমি তার সমর্থন করছি।
আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি, সেগুলোর নিশানা হলো অবৈধ স্থাপনা রোধ এবং ইসরায়েলি সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করা যাতে তারা এই পদক্ষেপ থেকে ফিরে আসে। পুরো ইসরায়েলের ওপর আমরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি না। কারণ তা হবে ইসরায়েলি জনগণকে শাস্তি দেওয়ার শামিল। সেখানকার জনগণের অনেকেই আছেন, যাদের অবস্থান সরকারের ওই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে।
সরকার ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তার জন্য ইসরায়েলি জনগণ দায়ী নয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ইহুদি জনগোষ্ঠীরও দায় এখানে নেই। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের পদক্ষেপের জন্য ব্রিটিশ ইহুদি কমিউনিটিকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। কারণ স্পষ্ট ও সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি হবে ইহুদি-বিদ্বেষ।
মাত্র গত সপ্তাহেই আমি ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমি জানি, দিন দিন তারা এক ধরনের ভীতির মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ইহুদি-বিদ্বেষ নির্মূল করতে আমার সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আজ আমরা যেসব পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি, তার মূল উদ্দেশ্য হলো কেবল সেই সমাধানের দিকে এগোনো, যার মাধ্যমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি জনগণ পাশাপাশি শান্তিতে ও নিরাপদে বসবাস করতে পারে। যুক্তরাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ ব্যাকুল হয়ে তা দেখতে চায়। সেটিই দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান। এই আশা বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমার নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বের অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাবে।
অ্যান্ডি বার্নহাম: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী; গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর
মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- মধ্যপ্রাচ্য