ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

সিফাতকে গ্রেপ্তার থেকে কী বোঝা গেল

সিফাতকে গ্রেপ্তার থেকে কী বোঝা গেল
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

খবরটি কয়েক দিন আগের। খবরের মূল জায়গা হলো, সিফাত আবদুল্লাহ নামে এক তরুণকে আটক করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। তবে আটকের বিষয়টি ঘটেছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করা এক ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করার পর। যদিও পুলিশের বরাতে গণমাধ্যম বলছে, গত জুন মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলের পর ওই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল! মজার ব্যাপার হলো, ভালোয় ভালোয় সিফাতকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা দাবি জানিয়েছেন।

দেশের গ্যাস-বিদ্যুতের যে অবস্থা তাতে কত মানুষ উঠতে-বসতে সরকার মহাশয়ের পিণ্ডি চটকাচ্ছে, আমরা তার খবর রাখি না বললে ভুল হবে বরং আমরা সেটিকে আমলে নিচ্ছি না। কারণ আমলে নিলে সমাধানের জোরালো প্রশ্ন সামনে আসে এবং সেটি করার সক্ষমতা সরকারের এই মুহূর্তে নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাই যেখানে বিদ্যুতের এমন সংকট সেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের ভৌতিক উপস্থিতি গ্রাহকের চূড়ান্ত বিরক্তিরই কারণ ঘটানোর কথা। আমার ৭৮ বছর বয়স্ক মা যখন রাত ১২টা বাজে রান্না করবেন বলে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকেন কিংবা বিদ্যুৎ কখন আসবে সে ক্ষণ গুনতে থাকেন, তখন সিফাতদের রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তিতে তাঁর অসংকোচিত সম্মতি থাকবেই। দেশের জনগণ এখন যদি এ পরিস্থিতিতে সরকারের সমালোচনা কিংবা সরকারপ্রধানকে ‘বকাঝকা’ করে কথা বলেন, তাহলে কি সরকার সবাইকে গ্রেপ্তার করবে? নাকি সিফাতের মাধ্যমে সবাইকে সাবধান করছে– এই বিষয়গুলো নিয়ে উচ্চবাচ্য করা যাবে না। করলে ‘বিপদ’ হবে। 

দ্বিতীয়ত আসি গালি প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দুই বছর ধরে ‘গালি’ অন্যতম স্থান দখল করে আছে। অনেকে এটিকে সহনীয় করার জন্য বলছেন, এটি ‘জেনজি ভাষা’। বিশেষ করে নারীবিদ্বেষী এবং নারীকে কেন্দ্র করে গালিগুলো রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি অনেক তরুণ রাজনীতিবিদের পরিচয় শুরু হয়েছিল গালি দিয়ে। তখন কিন্তু তাদের এই গালি ব্যবহার নিয়ে মানুষ অবাক হলেও এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কোনো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং এটিকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেওয়া হয়। তখনও এটি নিয়ে কাউকে খুব বেশি বিচলিত হতে দেখা যায়নি। গত দুই বছর গালির প্রতি রাষ্ট্রসহ অভ্যুত্থানের বিজয়ী পক্ষের সমর্থন দেখে বোঝার উপায় ছিল না– এটি অসম্মানজনক, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একেবারে বেমানান এবং অগ্রহণযোগ্য। এখন এই গালি যখন সরকারপ্রধানকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়েছে, তখন এর প্রতিবাদ হয়েছে। তার মানে কি এই, অমুককে গালি দিলে ঠিক আছে, কিন্তু তমুককে দিলে ঠিক নেই? অমুকের বিরুদ্ধে গালি দিলে খুশি হই, আর তমুকের বিরুদ্ধে দিলে বেজার হই। আমাদের বিচার-আচার, বিবেচনাবোধ সব ব্যক্তিকেন্ত্রিক। আসলে গালি কাউকে দেওয়া যায় না। গালির মূল উদ্দ্যেশই হলো উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে হেয়, অপমান করার তাগাদা। তাই এই সংস্কৃতিকে বাহবা না দিয়ে বরং বিদায় দেওয়াই ভালো।

এখন সরকার যে সিফাতকে গ্রেপ্তার করেছে সন্ত্রাস দমন আইনে, তার কী হবে? গালি বা প্রতিবাদ করা সন্ত্রাস কিনা– এই প্রশ্ন অনেকে তুলেছেন সামাজিক মাধ্যমে। এটি যদি সন্ত্রাস হবে তাহলে এতদিন যারা গালি দিল এবং এটিকে এখনও চলমান রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং ঘটেছে উল্টো। তাদের কেউ কেউ ‘বীর’-এর মর্যাদা পেয়েছেন। সিফাতের ক্ষেত্রে গালির ফলটা ভিন্ন কেন? সিফাতের গ্রেপ্তারের জমিনকে আরও শক্তিশালী করতে সর্বশেষ বলা হয়েছে, সিফাতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের যোগাযোগ রয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আগের একটি মামলায়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, অবস্থা এখন এমন, সরকার মনে করছে যে কোনো কিছুতে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা দেখাতে পারলে সেটি গ্রহণযোগ্য ‘এবং ‘বৈধ’ হয়ে যাবে। সে জন্য যখন সামাজিক মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়, তখনই সামনে আসে আওয়ামী লীগ। কেমন যেন বাড়তি কাপড় দিয়ে মুখ আটকানোর মতো। 

প্রশ্ন হলো, কথিত মামলা হওয়ার পরপর সিফাতকে গ্রেপ্তার না করে এখন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি নিয়ে ভিডিও বানানোর পর গ্রেপ্তার করা হলো কেন? সরকার কি এতে স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ তৈরি করল না? 

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারও অনেক ঘোষিত-অঘোষিত প্রশ্ন তোলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ নানা খাতে দায়মুক্তি জারি করেছিল। খোদ সংবিধান সংশোধন করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিল, জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া যাবে না; ক্ষমতাসীন সরকার প্রয়োজনে আরেক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারবে। বাস্তবে সব তাসের ঘরের মতো উড়ে গেছে। বাংলাদেশের বাইরেও এটি প্রমাণ হয়েছে– প্রশ্ন তুলতে দিতে হয়; সমালোচনা করার অধিকারের প্রতি সম্মান জানাতে হয়। প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলে বরং সরকার টেকসই হয়। 
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তব চিত্র হলো, যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা সরকারকে টেকসই রাখতে চায় ভিন্নভাবে। গণতন্ত্রের প্রতি শদ্ধাশীল হয়ে নয়, বরং গ্রেপ্তার, মামলার ভয় দেখিয়ে। তবে গ্রেপ্তার-মামলার বিপরীতে জনগণ কী বলে তা কান পেতে শুনুন। তাতেই রক্ষা পাবে গণতন্ত্র। এর বিপরীতে বরং উল্টোটা ঘটবে।
 
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

 

আরও পড়ুন

×