ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাদা কালো

‘ভোটব্যাংক’ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি এবং বাস্তবতা

‘ভোটব্যাংক’ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি এবং বাস্তবতা
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অতীতের ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তি দেশের সনাতন ধর্মের ভাইবোনদের তাদের ‘ভোটব্যাংক’ মনে করত। সেই ভ্রান্ত ধারণা ও মিথ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভেঙে দিয়েছেন। গত শুক্রবার বিকেলে জন্মাষ্টমীর মিছিলের আগে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা বিচার করেছেন। বিগত নির্বাচনে আপনারা অসুর শক্তির বিপক্ষে রায় দিয়েছেন।’

ফ্যাসিবাদী শক্তি তো বুঝলাম– আওয়ামী লীগ। কিন্তু ‘অসুর’ বলতে কাকে বোঝালেন তিনি? সম্ভবত জামায়াতে ইসলামীকে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা বটে! কিন্তু এ দেশে কে যে ফ্যাসিবাদী না– সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। 

বস্তুত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যে কথাটা বেশি কানে বাজল তা হলো, সনাতনী বা হিন্দু ভোটারদের আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতাকে তিনি ভ্রান্ত ধারণা ও মিথ বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু অন্তত ৫৬ বছরের একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হলো। বিশেষত নব্বই-পরবর্তী সময়ে এ ধারণার ভিত্তিতেই তো আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নির্বাচনী রণকৌশল সাজাতে দেখা গেছে। হিন্দুরা নৌকায় ভোট দিয়েছে– এমন ধারণা থেকেই কি ২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়নি? বিএনপি ও তার মিত্রদের বয়কট করা ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুরা কি ভোটদানের ‘অপরাধে’ নির্যাতনের শিকার হয়নি? শুধু তা কেন? ২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ যে তাণ্ডব চলল, তারও অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল হিন্দুরা। 
মনে আছে নিশ্চয়ই; হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সে সময় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতনের আড়াই হাজারের বেশি ঘটনা নথিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করল, এটা ‘পতিত’ আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচার। দুর্ভাগ্যজনক, সেই কোরাসে শুধু বিএনপি নয়; বামপন্থি দলসহ অন্তর্বর্তী সরকার সমর্থক সবাই যোগ দিল। এক পর্যায়ে এমন কথাও বলা হলো, কিছু সংখ্যালঘু ব্যক্তি হামলার শিকার হয়েছেন বটে, তবে সেগুলো ‘রাজনৈতিক’। অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুত দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণেই হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘু পরিবারগুলো আক্রান্ত। 

সরকারের এ দাবির অন্য দিকটিও খেয়াল করা দরকার। ঐক্য পরিষদ বর্ণিত আড়াই হাজার ঘটনার মধ্যে সরকারি বিবেচনায় কয়টি এ রাজনৈতিক ক্যাটেগরিতে পড়েছিল? কোনো উত্তর না থাকলেও ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় ওই ডিসেম্বর পর্যন্ত যে ৮৮টি মামলা হয়েছে, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে সেসব উল্লেখ করা হলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব হামলার বেশির ভাগই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণে।’

শফিকুল আলমের এ তথ্য সঠিক হলেও বলতে হবে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিশেষ সম্পর্কই সত্য। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের সঙ্গে হিন্দুদের বিশেষ সম্পর্ক যদি মিথও হয়, তা একটা নির্বাচনেই কীভাবে ভাঙে? যদি নির্বাচনটিতে আওয়ামী লীগ থাকত এবং তাতে সনাতনী ভোটাররা বিএনপিকেই বেছে নিত, তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা অন্তত বিচার-বিশ্লেষণে আনা যেত। কিন্তু সেই সুযোগ তারা জেনেবুঝেই রাখেননি।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর উল্টোটা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেশে হিন্দুদের সংখ্যা নানা কারণে কমে গেছে। এই নানা কারণের মধ্যে তাদের ওপর সরব-নীরব নির্যাতন যেমন আছে, তেমনি তাদের সুরক্ষা প্রশ্নে বিশেষত আওয়ামী লীগের উদাসীনতাও আছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ভোটের মূল্য না দেওয়ার বিষয়টি শুধু শুভানুধ্যায়ীরাই বলেননি; নির্যাতকরাও নির্যাতনকালে ক্ষোভ ঝেড়েছে, এত অবহেলার পরও নৌকার প্রতি টান কেন? 

আমরা জানি, প্রধানত মুফতে পায় বলেই হিন্দু ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো বিশেষ বিবেচনা ছিল না। তদুপরি, সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে দুর্বল করতে তার স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ইসলামবাদী দল ও সংগঠনকে কাছে টানার তৎপরতায় মনোযোগ বাড়িয়েছিল অসাম্প্রদায়িকতার দাবিদার দলটি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নিশ্চয় আওয়ামী লীগবিরোধী সংখ্যালঘুদের এ ক্ষোভও প্রভাব ফেলেছে। আন্দোলনকারী তরুণদের মধ্যে তাই বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর উপস্থিতিও বেশ চোখে পড়েছে।   

এটাও সত্য, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখনও চলমান মব সন্ত্রাসের মধ্যে সংখ্যালঘুরা নিপীড়িতের ঐক্যের মতো আওয়ামী লীগের প্রতি আবারও নরম হয়েছে। সর্বোপরি, নির্বাচনে হিন্দু ভোট এখনও একটা ফ্যাক্টর। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মনে করে, দেশের ৮০টির মতো সংসদীয় আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রভাব ফেলে সংখ্যালঘুদের ভোট (বিবিসি, ১০ জানুয়ারি ২০২৬)। এ কারণেই মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকলেও হিন্দু ভোট নিয়ে আগ্রহ বা জ্বালা কমেছে, বলা যায় না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত এ বিষয়ে কতটা তৎপর ছিল, তা নতুন করে বলার বিষয় নয়। সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁওসহ বহু আসনে জিতে আসা বিএনপির এমপিরা হিন্দু ভোটারদের কৃতিত্ব দিয়েছেন।

একই কারণে ভোট সামনে রেখে হিন্দুদের মধ্যে অনেক জায়গায় আতঙ্ক তৈরির চেষ্টাও কম হয়নি। গত বছর মে মাসে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হিন্দু অধ্যুষিত যশোরের অভয়নগরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামের মতুয়া সম্প্রদায়ের ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর চট্টগ্রামের রাউজানসহ একাধিক এলাকায় বসতবাড়িতে আগুন; ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দীপু চন্দ্র হত্যা এবং পরপর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে। 

গত নির্বাচনে হিন্দুরা কেন বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলেন– অজানা নয়। এটাও নতুন তথ্য নয় যে, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট এবং সত্তরের নির্বাচনেও নৌকা ছিল সনাতনীদের ভরসা। মুক্তিযুদ্ধে তারা যে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেন; স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার উপযুক্ত স্বীকৃতি না পেলেও তারা দশকের পর দশক নৌকার সঙ্গেই থেকেছেন। এ ক্ষেত্রে মুখ্যত বিকল্পের অভাব কাজ করলেও এটা মানতে হবে– উদার গণতন্ত্রী রাজনীতিতে আওয়ামী সীমাবদ্ধতা নিয়ে যারা কথা বলেন তারাও ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানের সন্ধান দিতে পারেননি। কথাটা বিএনপি তো বটেই; যারা প্রগতির চর্চা করেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×