সমকালীন প্রসঙ্গ
ট্রাম্প-অর্থনীতির পারস্পরিকতার ফাঁদ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয়তাবাদ ও সংরক্ষণবাদ নীতিতে দেশীয় উৎপাদককে সহায়তা ও বিদেশি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে যাচ্ছেন। উভয় মেয়াদেই ট্রাম্প-অর্থনীতি (ট্রাম্পোনমিক্স ১.০ এবং ২.০) সুরক্ষামূলক শুল্ক আরোপ, করপোরেট কর হ্রাস এবং নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা বজায় রেখেছে। সে মতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দেশের ওপর পারস্পরিক তথা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ঘোষিত ৩৭ শতাংশ শুল্ককে পরে কমিয়ে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করেন। আরও ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে ঠিক করতে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি-২০২৬’ স্বাক্ষর করে।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চুক্তিটি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্রয়-প্রতিশ্রুতি ও কৌশলগত নিরাপত্তার প্রতিকূল শর্তগুলো বেশ সমালোচিত হয়। প্রশ্ন হলো, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে কোন ধরনের পারস্পরিকতায় আবদ্ধ হয়ে চুক্তিটি করে গেলেন? পেছনে নিছক দায়বদ্ধতা কিংবা লেনদেনমূলক অচলাবস্থা; যেটাই থাকুক, চুক্তিটির মাধ্যমে বাংলাদেশ কি পারস্পরিকতার ফাঁদে পড়ে গেছে? সেই চুক্তির ধারাবাহিকতা হয়তো আমরা দেখতে থাকব।
কদিন আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ইতোমধ্যে চুক্তিকৃত ১৪টি বোয়িং ক্রয় এবং আরও কয়েকটি লিজ নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। যদিও তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর এক পোস্টে আরও বোয়িং কেনার এক দারুণ চুক্তির খবর দেন। এটা কি ছিল জোরপূর্বক শ্রম-সংক্রান্ত শুল্কে কিঞ্চিৎ ছাড়ের জন্য অতিরিক্ত আবদার? উল্লেখ্য, ২৪ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকরী এই নতুন শুল্ক অনেক দেশের ওপর ১২.৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের জন্য ১০ শতাংশ। এরই মধ্যে বোয়িং কেনার জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ধন্যবাদ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর মন জোগানোর মতো কেনাকাটা কতবার করা সম্ভব হবে?
এদিকে বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী, ৩.৭ বিলিয়ন ডলারে চুক্তিকৃত ১৪টি বোয়িং কেনা ছাড়াও আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানিপণ্য কিনতে হবে। আর এই চুক্তিতে বাংলাদেশের মনোযোগ ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে হলেও শুল্কমুক্ত পোশাক রপ্তানি! তবে প্রশ্ন হলো, তা কতটা করা যাবে? একটি দৈনিকের তথ্যসূত্রে, বাংলাদেশি পোশাকের ওপর বর্তমান শুল্কহার ২১.৬ শতাংশ, যেটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে ছিল ১৫.২ শতাংশ। নতুন শ্রম-সংক্রান্ত ১০ শতাংশ শুল্ক কেবলই আগেকার ১০ শতাংশ বৈশ্বিক সাময়িক শুল্কের প্রতিস্থাপন হওয়ায় বাংলাদেশ আপাত ক্ষতিতে পড়ছে না। তবে আশির দশক থেকে উদীয়মান তৈরি পোশাক শিল্পের তো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি হয়নি। আমদানিকৃত কাপড় ও উপকরণ ব্যবহারের কারণে গড় মূল্য সংযোজন ৩০ শতাংশের বেশি নয়। তারপরও স্বল্পমূল্যের পণ্যটির রপ্তানিতে ক্রমশ বাড়ছে শুল্ক চাপ! ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানি ছিল ৯.৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৮.২ বিলিয়ন ডলারই পোশাক খাত থেকে। এই রপ্তানি পণ্যের পেছনে প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় সমন্বয়ের পর মূল্য সংযোজন তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকে কি? তবু কয়েক বছর ধরে কমছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে ৬.২৫ শতাংশ। অথচ এক বছরেই আসছে একাধিক বিলিয়ন ডলার চুক্তির চাপ। এমন নেতিবাচক পারস্পরিকতার ফাঁদে পড়েও আমরা শ্রমনিবিড় পোশাক খাত নিয়েই স্বপ্ন দেখছি!
এদিকে গেল অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতে ঋণাত্মক (০.২৮ শতাংশ) প্রবৃদ্ধি হয়ে গেল। আর্থিক প্রণোদনা চলমান থাকা সত্ত্বেও এমন পতন থেকে উত্তরণে সরকার আর কতটা করতে পারবে? তার একদিকে আছে ভঙ্গুর আর্থিক খাত নিয়ে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানোর প্রয়াস, অন্যদিকে বৈশ্বিক সংঘাত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট মোকাবিলার চাপ। তারপরও আছে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বছরে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার পরিশোধের চাপ। অতীতে আমাদের বড় ভুল ছিল উদীয়মান সিমেন্ট, ওষুধ কিংবা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অত্যধিক মনোযোগী না হওয়া। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এসে তেমনি উচ্চ মূল্য সংযোজনশীল যন্ত্রপাতি, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স এবং আইসিটি-ভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের বিষয় অনুধাবন করতে বড় দেরি হয়ে গেছে। তবু যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য উন্নত দেশের বিনিয়োগ পেয়ে আমদানি-পরিবর্তক হিসেবেও যদি গড়া যায়, তাতেই কম কী?
আমরা প্রতীক্ষায় ছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর বোয়িং বিক্রি নয়, বরং বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বার্তা দেবেন। নয়তো প্রশ্ন জাগে, সফরকারী প্রতিনিধিরা আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির উত্তরণ নিয়ে ভাবছেন তো? নাকি তারা শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়েই তৎপর! এ কথা সত্য, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনি কাঠামোতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও শিল্প-সংকোচনের চক্রে পড়লেও চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য। যদিও ট্রাম্প প্রবর্তিত পাল্টা শুল্ক আদালত কর্তৃক বাতিল হয়েছে, তবুও আলোচনার মাধ্যমে কোনো সুবিধা আদায় করা কি সহজ হবে?
ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]