ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাবলিক পরীক্ষা

সরকার বদলালে পাসের হার বদলায় কেন

সরকার বদলালে পাসের হার বদলায় কেন
×

সাব্বির নেওয়াজ

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবলিক পরীক্ষায় আগে অনেক বেশি পাস করত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে পাসের হার কমতে শুরু করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার বদলালে কি শিক্ষার্থীদের মেধাও বদলে যায়? কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটি একেবারেই অমূলক মনে হয় না। যে দেশে একসময় পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে উঠেছিল, সেই দেশেই এখন এসএসসিতে পাসের হার ৬২ শতাংশ এবং এইচএসসিতে ৫৯ শতাংশের কাছাকাছি। তাহলে এতদিন যারা পাস করছিল, তারা কি সবাই সত্যিই পাসের যোগ্য ছিল? নাকি পরীক্ষার খাতা, প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়নের ধরনই তাদের পাস করিয়ে দিচ্ছিল?

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অথচ ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছিল এক লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ কমেছে ৬৫ হাজারের বেশি। এইচএসসিতে একই চিত্র। তাহলে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা কি এক বছরে এতটা কমে গেল? 

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা ছিল নতুন বাস্তবতায় প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা। এর পর থেকেই উত্তরপত্র মূল্যায়নে দীর্ঘদিনের কথিত ‘উদারতা’ থেকে সরে আসার কথা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে পাস নম্বরের কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীদের কিছুটা বাড়তি নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল। গ্রেড পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও কখনও কখনও নমনীয়তা দেখানো হতো। উত্তর পুরোপুরি সঠিক না হলেও ‘চেষ্টা’ বিবেচনায় আংশিক নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতিও ছিল। যদি এসব তথ্য সত্য হয়, তাহলে আগের উচ্চ পাসের হারকে শিক্ষার মানের সরল সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বরং প্রশ্ন উঠবে– আমরা কি বছরের পর বছর ফলকে সুন্দর দেখাতে গিয়ে শিক্ষার বাস্তব চিত্র আড়াল করেছি?
শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কখনোই শুধু কতজন পাস করল কিংবা কতজন জিপিএ ৫ পেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সেটিই হয়েছে। পাসের হার বাড়লে সরকারের সাফল্য, প্রতিষ্ঠানের সাফল্য, শিক্ষকের সাফল্য– সবকিছুর প্রচার হয়েছে। বিপরীতে ফল খারাপ হলে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীকেই দায়ী করা হয়েছে।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার ভেতরে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হয়েছে পরীক্ষার ফল ভালো করার জন্য; শেখার জন্য নয়। শিক্ষককে ভালো ফল দিতে হয়েছে; শিক্ষার্থীকে ভালো ফল করতে হয়েছে; প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ পাস দেখাতে হয়েছে। ফলে ‘কতটা শিখল’– প্রশ্নটি অনেক সময় ‘কত পেল’ প্রশ্নের আড়ালে হারিয়ে গেছে। তবে বর্তমান ফলের পতনকে শুধু ‘মূল্যায়ন কঠোর হয়েছে’ বলে উদযাপন করারও সুযোগ নেই।

কারণ, যদি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯০ জনের বেশি পাস থেকে হঠাৎ ৬২তে নেমে আসে, তাহলে দুটি সম্ভাবনাই সামনে আসে। হয় আগের মূল্যায়ন ছিল অতিরিক্ত নমনীয় অথবা বর্তমান শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতায় বাস্তব অবনতি ঘটেছে। এমনকি দুটি একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আত্মতুষ্টি কিংবা আতঙ্ক– কোনোটিতেই না গিয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ।
কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে? কোন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে? শহর ও গ্রামের ফলের ব্যবধান কত? কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের হার বেশি? শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা কেমন? শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাঠদান কতটা হচ্ছে? শিক্ষার্থীদের মৌলিক গণিত, ভাষা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা কতটা তৈরি হয়েছে? প্রশ্নপত্র কি পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি কি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘খাতা এবার ঠিকমতো দেখা হয়েছে’ বললে সমস্যার সমাধান হবে না।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে শুধু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২৬। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; আমাদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষার ভয়াবহ বৈষম্যেরও ইঙ্গিত। একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করলে শুধু শিক্ষার্থীদের অযোগ্য বলে দায় শেষ করা যায় না। সেখানে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা, উপস্থিতি, পাঠদান, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা– সবকিছুর তদন্ত প্রয়োজন।
একইভাবে পাসের হার কমে যাওয়াকে ‘শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রমাণ’ হিসেবেও সরলীকরণ করা বিপজ্জনক। প্রকৃত মূল্যায়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা তার চেয়েও বেশি দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যায়ন যেন সরকার বদলের সঙ্গে না বদলায়।

এক সরকারের আমলে যদি বেশি পাসকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর পরের সরকারের আমলে কম পাসকে ‘বাস্তব মূল্যায়ন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মূল্যায়নের নীতি হতে হবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে।

সাব্বির নেওয়াজ: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×