নাইন ইলেভেন
২৫ বছরের মার্কিন আগ্রাসনে দেশে দেশে মানবিক পরিণতি যেমন
মা খাবার কিনে ফিরবে- সে অপেক্ষায় বোনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোরী। ২০০৩ সালের ২৯ মার্চ ইরাকের বসরায়। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
আল জাজিরা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০৭ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:২১
চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে আল-কায়েদা হামলা চালায় ২৫ বছর আগে। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হয়। এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একের পর এক যুদ্ধ। ২০০১ সালের পর থেকে প্রতি বছরই বিশ্বের কোথাও না কোথাও মার্কিন বাহিনী বোমা হামলা চালিয়েছে। এতে বিপর্যস্ত হয়েছে লাখো মানুষের জীবন।
ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে আগ্রাসন শুরু হয় ২০০৩ সালে। সে সময় শিক্ষার্থী ছিলেন ওমর (ছদ্মনাম)। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এরপর সবকিছু বদলে গেছে।
গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সামরিক অভিযান ও যুদ্ধে মানবিক পরিণতি বরণ করেছে অন্তত আটটি দেশের মানুষ। ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কথা বলে এই আগ্রাসন শুরু হয় ৯/১১ হামলার কয়েকদিন পর।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: নিহত ৪৫ লাখ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১ নামে পরিচিত) ওই হামলার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। এর মধ্য দিয়ে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হয় বলে দাবি করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। আফগানিস্তানের পর ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক সামরিক অভিযান চালানো হয়।
_1789121528.png)
এসব যুদ্ধে হতাহতের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করেছে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স। তাদের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে।
এর মধ্যে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে প্রাণ গেছে ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের। রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে পরোক্ষভাবে মারা গেছে ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ।
আফগানিস্তান: যুদ্ধে সরাসরি নিহত ১ লাখ ৭৬ হাজার
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান সরকারের পতন হয়। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদে এই যুদ্ধ প্রায় ২০ বছর ধরে চলে।
কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হয়। এছাড়া ক্ষুধা, রোগ ও আঘাতের চিকিৎসা না পেয়ে আরও কয়েক লাখ মানুষ মারা গেছে।
_1789121653.png)
যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানের ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগতো। যুদ্ধের পর এই হার বেড়ে ৯২ শতাংশে দাঁড়ায়। অবিস্ফোরিত অস্ত্র ও স্থলমাইনের কারণে এখনো বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারাচ্ছে। সন্ত্রাসবিরোধী এই যুদ্ধের সমাপ্তি হয় তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে।
ইরাক: যুদ্ধে সরাসরি নিহত ৩ লাখ ১৫ হাজার
আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর দুই বছরের কম সময় পর, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে। ওই সময় ওমরের বয়স ছিল ১৮ বছর। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এখনো বোমার শব্দ মনে করতে পারি। খুব ভয় পেয়েছিলাম।’
যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখতে ওমরের কয়েকজন বন্ধু তখন বাগদাদে গিয়েছিলেন। ওমর বলেন, পরিস্থিতি তখন খুব বিপজ্জনক ছিল। না যাওয়ার জন্য তাদের সতর্ক করেছিলাম। তারা এরপরও বাগদাদে যায়। আর ফিরে আসেনি। সে কথা মনে হলে এখনো খুব কষ্ট লাগে।
বিমান হামলা ও ড্রোন যুদ্ধ
স্থলভিত্তিক যুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং আইএসএলের বিরুদ্ধে ইরাক-সিরিয়ায় অঘোষিত বিমান ও ড্রোন অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০০৪ সাল থেকে এসব হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ৪২৩টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২৪ থেকে ৯৬৬ জন বেসামরিক নাগরিক।
ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক নাগরিক।
সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯-২৩টি হামলায় ১৮৮-২৭৬ জন নিহত হয়েছে।
_1789121805.png)
লিবিয়ায় ২০১১ সালে বিক্ষোভ শুরু হলে তা দমনের চেষ্টা করেন তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি। তখন বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নেতৃত্বে বিমান হামলা চালানো হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে লিবিয়ায় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়। এরপর বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি নিহত হন।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’। লক্ষ্যবস্তু ছিল আইএসআইএল। এতে ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানোর পাশাপাশি কয়েক হাজার বোমা ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেন।
তবে লন্ডনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা এয়ারওয়ার্সের হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ জনের মধ্যে হতে পারে।
বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি
কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১- পরবর্তী যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের কেউ দেশের বাইরে, আবার কেউ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দুই দশকের বেশি সময় পরও মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্ত পার করে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। ইরাকে আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে।
বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে ৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা (ছদ্মনাম) জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে যাতায়াত করে কাটিয়েছেন। তাঁর পরিবার ১৯৯৪ সালে প্রথম আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যায়। ২০০০ সালে তারা দেশে ফিরে আসে। কিন্তু ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আবারও পালিয়ে যায়।
ইরানে ১১ বছর থাকার পর আয়েশা ও তাঁর সন্তানদেরকে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। আয়েশা বলেন, ‘আমি অনেকবার গিয়েছি এবং ফিরে এসেছি। ইরানিরা আমাদের বের করে দেয়। আমার সন্তানদেরও স্কুল থেকে বহিষ্কার করে।’