রাষ্ট্রচিন্তা
আত্মসত্তা ও আত্মপরিচয়ের সংকট
সেলিম জাহান
সেলিম জাহান
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতির আত্মসত্তা ও আত্মপরিচয় নিয়ে আলোচনা নতুন নয়; প্রায়ই সভা-সেমিনারে বিষয়টা ওঠে। বিদ্বজ্জন কেবল নন; রাজনীতিবিদরাও প্রায়ই জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ-বিনির্মাণ নিয়ে কথা বলেন। যেমন সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বলেছেন, ‘ইতিহাস চর্চাই জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি’ (বাসস, ৮ জুলাই ২০২৬)। সংস্কৃতিমন্ত্রী আরেক অনুষ্ঠানে ‘ইতিহাসের সঠিক উপস্থাপন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে’ জাতির আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন (প্রথম আলো, ২৪ জুন ২০২৬)।
কেবল ইতিহাস চর্চা বা সংরক্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জাতির আত্মপরিচয়ের জন্য যথেষ্ট কিনা, আলোচনার বিষয়। কিন্তু জাতিগত আত্মপরিচয়ের আগে আসে ওই জাতিভুক্ত মানুষের আত্মসত্তা।
দুই.
একজন মানুষের নানান সত্তা থাকে। থাকে নানান পরিচয়। এই যে আমি– আমি তো একজন বহুধাসত্তাসম্পন্ন মানুষ। আমি দক্ষিণ এশীয়, আমি বাঙালি, আমি একটি নির্দিষ্ট বয়ঃক্রমের, আমি পুরুষ, আমি একজন শিল্প-সাহিত্যরসিক, আমি দুই কন্যার জনক ইত্যাদি।
বহুধা পরিচয়ের নানান মাত্রিকতা আছে। এ সত্তাবলয় যত প্রসারিত করব তত আমার সত্তার বৈচিত্র্য বাড়বে, সন্দেহ নেই। সেই বৈচিত্র্য যদি আমরা মেনে নিই এবং মানুষের যে কোনো সত্তার প্রতি যদি শ্রদ্ধাশীল হই, তাহলে বৈচিত্র্যই শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। মুশকিল হচ্ছে, আমরা প্রায়ই আমাদের বহুধাসত্তার একটিকেই বেছে নিই একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে। মনে করি, সেটিই আমার শ্রেষ্ঠতম সত্তা এবং অন্য যারা সে সত্তার অনুগামী নন, তারা নিকৃষ্টতর; গ্রহণযোগ্য নন। সে অবস্থায় বিভাজন, বিরোধ ও সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী।
উপর্যুক্ত চিত্রটি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ধর্মসত্তার ক্ষেত্রে। ধর্মসত্তা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ কথা মেনে নিয়ে অন্য সবার ধর্মসত্তার প্রতি যদি শ্রদ্ধাশীল, সহিষ্ণু ও সহনশীল থাকি– ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, তাহলে যে কোনো সমাজে বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। আমাদের সমাজে চিরায়তভাবে সেটাই হয়ে এসেছে। কালক্রমে বিভিন্ন সমাজে এ জাতীয় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধ লুপ্ত হয়ে তার বদলে স্থান করে নিয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনা ও অসহিষ্ণুতা। প্রশ্ন থেকে যায়, বিভাজন তো অন্যান্য ক্ষেত্রেও আছে। তা তো সংঘর্ষে গিয়ে পৌঁছুয় না। কই; এটা তো শুনিনি– উচ্চাঙ্গ সংগীতপ্রেমীরা অন্যান্য সংগীতরসিকের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন। তাহলে ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অসহিষ্ণু রূপ নেয় কেন?
একটি কারণ হয়তো বেশ জোরালো। অনেকে অন্য সব সত্তাকে গৌণ করে শুধু ধর্মীয় সত্তাকেই একমাত্র ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেন; শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মতো এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে চরম অবস্থান নেন। স্ব স্ব ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অনড় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ এমনকি সহনশীলতাও ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বাঙালিয়ানা’ আত্মসত্তাকেও বস্তুনিষ্ঠ নিরিখে দেখা যেতে পারে। আমরা অনেক সময়ে বাঙালিয়ানাকে খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন, বাহ্যিকভাবে দেখি। যেমন পোশাক-আশাক বা খাবারদাবারে বাঙালিয়ানা। আসলে সত্যিকারের বাঙালিয়ানা একটি বোধ, উপলব্ধি, মূল্যবোধ, চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, যা হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত। যে কারণে পাজামা-পাঞ্জাবি পরলেই ব্রিটিশ-ফরাসি কেউ ‘বাঙালি’ হবেন? বহু প্রবাসী বাঙালি বিদেশি খাবারই খেয়ে থাকেন। তাতে কি তার বাঙালিয়ানা কমে যায়?
ধর্মসত্তার মতো জাতিসত্তাও অনেক সময় কট্টর হয়ে উঠতে পারে। বস্তুত যখন আমরা ধর্মীয় কিংবা বাঙালিয়ানা আত্মপরিচয়কে অনমনীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদী স্তরে নিয়ে যাই, যেখানে অন্য সবকিছু অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, সমস্যাটা দেখা দেয় তখনই। ধর্মীয় ও জাতিসত্তাভিত্তিক গোঁড়ামি– দুটোই বিপজ্জনক। একটি উগ্র ধর্মান্ধতার জন্ম দেয়, অন্যটি জন্ম দেয় উগ্র জাতীয়তাবাদের। ধর্মান্ধতার ফলে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হয় এবং চরম জাতীয়তাবাদ জাতিগত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে। এ অবস্থায় সহিংসতা ও সংঘর্ষ অনিবার্য।

তিন.
প্রশ্ন হচ্ছে, উগ্র জাতীয়তাবাদের ঝুঁকি এড়িয়ে আত্মপরিচয় হিসেবে বাঙালিয়ানা কীভাবে চর্চিত হবে? অনেকেই প্রশ্ন করেন, বাঙালিয়ানার জন্য বাংলা ভাষা জানা অনিবার্য কিনা? আমি মনে করি, জরুরি; প্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু অপরিহার্য কিংবা অনিবার্য নয়। প্রবাসে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ প্রবাসে বড় হয়ে ওঠা এবং বাংলা না জানা ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত– বিদেশে বাঙালিয়ানার ভবিষ্যৎ ভঙ্গুর কিনা। সত্য, ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা প্রাণ দিয়েছি এবং ভাষার সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল উৎস। কিন্তু সময় ও বাস্তবতার বিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বাস্তববাদীও হতে হবে।
প্রথমত, প্রবাসে পূর্ব প্রজন্মের বাঙালিরা বাংলা ভাষার ব্যাপারে যতটা আবেগি, বর্তমান প্রজন্ম ততটা নয়। আমরা বয়োজ্যেষ্ঠরা চাই, প্রবাসে ছেলেমেয়েরা বাংলা ভাষাটা জানুক। কিন্তু প্রবাসে যেখানে দিনের বেশির ভাগ সময়ে ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজ কিংবা কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি বলে, সেখানে বাড়ি ফিরে তারা কতটা বাংলা চর্চা করতে পারবে? ভাষা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন, এ পরিস্থিতিতে তারা বাংলা ভাষার চর্চা কীভাবে ধরে রাখতে পারবে। আমি শুধু জানি, পথটি সহজ নয়।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বাংলা ভালো না জানার সমস্যাটি শুধু প্রবাসের নয়, দেশজও বটে। বাংলাদেশেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো আলাদা মর্যাদা পায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। আজকের সমাজে ইংরেজিকে আভিজাত্য, কৌলীন্য ও উচ্চবর্গীয় মনে করা হয়। দেশের বহু ছেলেমেয়ে ঘরে-বাইরে ইংরেজি বলে ঠিক তাদের প্রবাসী জ্ঞাতিদের মতো।
তৃতীয়ত, ইদানীং দেশে-বিদেশে আন্তঃজাতিসত্তা এবং আন্তঃবর্ণের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এক-দুই প্রজন্ম পরে এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা শুধু জানবে, তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ বাঙালি ছিল; কিন্তু তাদের মাঝে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব হবে শূন্য।
এ অবস্থায়, আমার মতে, দুটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মা-বাবাদের। প্রথমটি অগ্রাধিকার নির্বাচন। প্রবাসের বাস্তবতায় আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলা পড়তে, লিখতে ও বলতে পারবে– নিতান্তই দুরাশা। আমরাই বরং প্রত্যাশাকে সীমিত করে আনি না কেন। আপাতত বাংলা পড়াটা ও লেখাটা বাদ যাক; বলাটা বজায় থাকুক। দ্বিতীয়ত, বাঙালিয়ানার নানান অনুষঙ্গ তারা শিখুক না ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় লিখিত প্রাসঙ্গিক বই থেকে।
উৎসাহিত করা যাক বাংলা নাটক দেখতে ও গান শুনতে। চাখুক না তারা বাংলা খাবার; পরুক না বিশেষ দিনে বাঙালি পোশাক! এভাবেই ক্রমান্বয়ে বাঙালিয়ানা তারা ধারণ করবে; বাহকও হবে বাঙালিয়ানার। তারাও গর্বিত হবে তাদের বাঙালি আত্মপরিচয়ে।
চার.
খোদ বাঙালিয়ানার চর্চাও আত্মপরিচয়ের সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ বাঙালিয়ানার বহিঃপ্রকাশ বহু ক্ষেত্রে বড় বেশি প্রতীকী ও বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছে। পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ এলেই তা বড় প্রকট হয়ে পড়ে। প্রতীকের প্রয়োজন আছে, স্বীকার করি। কিন্তু প্রতীক এবং বাণিজ্য যখন মূল বিষয়কে গ্রাস করে, তা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।
আত্মসত্তা ও আত্মপরিচয়ের অগ্রযাত্রার জন্য বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আরও বিশদ ও গভীরভাবে ভাবা দরকার। কেবল আত্মপরিচয় সংকট নিয়ে আলোচনা কিংবা খেদ কোনো কাজে আসবে না। জাতিগত আত্মপরিচয় কিংবা ব্যক্তির আত্মসত্তার সংকট কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে মিটবে না; যেমন গড়েও উঠবে না কেবল আলোচনা ও বক্তব্যে। বরং এ জন্য প্রয়োজন গবেষণা, জাতীয় কর্মসূচি। আমাদের আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান সত্তা বাঙালিয়ানা নিয়েও সেটা সূচিত হতে পারে।
ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
- বিষয় :
- রাষ্ট্রায়ত্ত