ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

সমৃদ্ধির স্বার্থে আঞ্চলিক বাণিজ্য এগিয়ে নিতে হবে

সমৃদ্ধির স্বার্থে আঞ্চলিক বাণিজ্য এগিয়ে নিতে হবে
×

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভূ-রাজনৈতিক সংকট বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং সৌদি-ইয়েমেন সংঘাত তথা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের হরমুজ ও লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে পণ্য পরিবহন ব্যাপক সংকুচিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। শুক্রবারের খবর, জ্বালানি তেল ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠেছে, যা গত জুনেও ছিল ৭০ ডলার।

বাংলাদেশের মূল রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানির অন্যতম যাত্রাপথ এ দুই প্রণালি। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে হলেও জ্বালানি আমদানি, সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীলতা এবং তৈরি পোশাকের কাঁচামাল সরবরাহের কারণে দেশের রপ্তানি খাত সরাসরি ধাক্কা খেয়েছে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকির কারণে বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানি তাদের অপারেশন সাময়িক স্থগিত করেছে অথবা বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে। এর ফলে কনটেইনারজট সৃষ্টি হচ্ছে; পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগছে। ব্যয় বাড়ছে এবং যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা প্রিমিয়াম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সমুদ্রপথে সময় বেশি লাগায় অনেক জরুরি শিপমেন্ট আকাশপথে পাঠাতে হচ্ছে, যা রপ্তানি ব্যয় করছে বহুগুণ।

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতি বজায় রাখতে আঞ্চলিক বাণিজ্যের দিকে চোখ রাখা এখন সময়ের দাবি। তৈরি পোশাকের জন্য শুধু ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভর না করে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যনীতি জোরদার করা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি ও অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়া।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে শুরু করার একটি প্রক্রিয়া। এটি অনেক দূরদর্শী চিন্তা। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থান পুনর্নির্ধারণের একটি কৌশলগত এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এশিয়ান অঞ্চলে নতুন বাজার অনুসন্ধান, বৈদেশিক বিনিযোগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সংযুক্তি এবং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য বৃদ্ধি এই পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য ।

বিশ্ববাণিজ্যের বর্তমান প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন ও ভোগের কেন্দ্র ধীরে ধীরে পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো অর্থনীতি। তাই বাংলাদেশের জন্যও নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন আবশ্যিক অর্থনৈতিক প্রয়োজন বলা চলে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার অর্জন করবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা হ্রাসের লক্ষ্যে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য জোট ‘রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’-আরসিইপিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি একটি অর্থনৈতিক আবশ্যকতায় রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক পরিবর্তিত বাস্তবতায় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটগুলো কেবল বাণিজ্যিক সহযোগিতার কাঠামো নয়; বরং ভূ-অর্থনৈতিক শক্তির নতুন ভিত্তি হিসেবে আবির্ভূত।  

এগুলোর কোনোটাই বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্য সম্প্রসারণ উদ্যোগের বিকল্প নয়। কথায় আছে, আপনি যা-ই করেন, প্রতিবেশী বদলাতে পারবেন না। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সমতার ভিত্তিতে বাণিজ্য এগিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে এবং এ কারণে সেখানে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন হওয়ায় এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনেও বিদ্যমান ব্যবস্থা অনেকটা অনুকূল। 

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয় এবং এটি বাড়ানোরও অনেক সুযোগ আছে। যদিও আরাকান রাজ্যের অস্থিরতায় এই মুহূর্তে তা হয়তো ততটা সফল হবে না। ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। মিয়ানমারে বাণিজ্য সহজীকরণ হলে রপ্তানি অনেক বাড়ানো সম্ভব। এক সময় মিয়ানমার নিজেদের সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তারপরও মিয়ানমারের সঙ্গে কিছু পণ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে বৈধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক চলে আসছে দীর্ঘদিন। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য অনেক বেশি সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতে পারে। নিকট প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিনেও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি না পাওয়ার অন্যতম কারণ দুই দেশের মধ্যে নৌ ট্রানজিট না থাকা। বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কানেক্টিভিটি বা সংযোগ ঘটানোকেই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মধ্যে নৌ প্রটোকল এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীরা চাইলেও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে নেপালে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি আয় বাড়ছে। উভয় দেশের সরকার ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করলে এটি আরও বহুগুণ করা সম্ভব। নেপালে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনও অনেকটা সীমিত। নেপাল প্রাকৃতিকভাবে বন্দর সুবিধাবঞ্চিত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরপ্তানি করতে পারে। এ জন্যও ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিশেষ করে চার দেশীয় (ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান) সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে রপ্তানির পথ সুগম হবে এবং রপ্তানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ এই চার দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়লে আলোচ্য দেশগুলোর সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন সহযোগিতার পথ সুগম হবে। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি বাড়াতে আঞ্চলিক বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×