ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্মম হত্যাকাণ্ড

অপ্রতিম, আমাদের ক্ষমা কোরো না

অপ্রতিম, আমাদের ক্ষমা কোরো না
×

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম

সোহেল নওরোজ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৯

অপ্রতিমের এমন এক বয়স, যখন পৃথিবীকে ভয় পাওয়ার কথা নয়; কৌতূহলী হওয়ার কথা। স্কুল, বন্ধু, পরিবার, ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, কিছু শখ, মান-অভিমান– এসব নিয়েই আবর্তিত হওয়ার কথা তার জগৎ। অথচ অপ্রতিমকে সেই জগৎ থেকে এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো, যা কোনো শিশুর ভাগ্যে লেখা থাকা উচিত নয়।
তার মৃত্যু আমাদের শোকাহত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে। আমরা স্তব্ধ, স্তম্ভিত হয়ে গেছি। একটি শিশুর এমন পরিণতি কেবল তার পরিবারের জন্য শোকের নয়, নষ্ট সমাজের প্রতিচ্ছবিও। এ ঘটনা আমাদের ভেতরে অন্য রকমের ভয় তৈরি করে– হত্যার ঘটনায় যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের বয়সও খুব বেশি নয়; অর্থাৎ জীবনের প্রারম্ভে দাঁড়িয়েই তারা পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট অপরাধ করে ফেলছে! সামান্য লোভ, ক্ষোভ কিংবা চাওয়ার জন্য আরেকজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার চিন্তা এত অল্প বয়সী কারও মাথায় আসে কীভাবে? অপ্রতিমের ঘটনা তাই আমাদের শুধু শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবায় না; আমাদের শিশু-কিশোরদের মনোজগতের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবায়। 

কৈশোর তো স্বপ্ন দেখার বয়স! নতুন বন্ধু বানানোর বয়স। অভিমান করার, মাঠে খেলার, ভুল করার এবং সেই ভুল থেকে শেখার বয়স। সেই বয়সে কারও মনে যদি হত্যার মতো চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতার জায়গা তৈরি হয়, তবে শুধু অপরাধী খুঁজলেই আমাদের কাজ শেষ হতে পারে না। আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে।
কোথাও কি আমরা বড় কোনো ভুল করছি?
আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি– এখনকার ছেলেমেয়েরা বদলে গেছে। কিন্তু তারা তো নিজেরা নিজেদের পৃথিবী তৈরি করেনি। তারা আমাদেরই ঘরে বড় হচ্ছে। আমাদের ভাষা শুনছে, আমাদের আচরণ দেখছে, আমাদের সমাজ থেকে শিখছে।
তাহলে তারা শিখবে এমন উদাহরণ সামনে আছে তো!

শিশু-কিশোররা কাকে দেখে শিখবে যে রাগ হলেই আঘাত করতে হয় না? কার কাছ থেকে শিখবে, অন্যের জিনিস সুন্দর লাগলেও সেটি নিজের করে পেতে হবে– এমন কোনো নিয়ম নেই! কে তাদের দেখাবে যে না-পাওয়াও জীবনের অংশ! শক্তিশালী হওয়া মানে দুর্বলকে ভয় দেখানো নয় বরং নিজের রাগ, লোভ আর প্রতিহিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা!

আমরা সন্তানের পড়াশোনার খবর রাখি। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন স্কুলে পড়ে, ভবিষ্যতে কী হবে– তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি। তার প্রয়োজনের জিনিস কিনে দিতে চেষ্টা করি। কিন্তু সে মানুষ হিসেবে কেমন হচ্ছে, সে খোঁজটা কি একই গুরুত্ব দিয়ে রাখি?
সে অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, বন্ধুর ভালো কিছু দেখে খুশি নাকি ঈর্ষান্বিত হয়, না পেলে কী করে, রাগলে তার ভাষা কেমন হয়, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কিনা, অন্য মানুষের কষ্ট তাকে কতটুকু স্পর্শ করে– এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সন্তানের পরীক্ষার ফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যবোধ পরীক্ষার মতো ক্ষণিক বিষয় নয়। এটি প্রতিদিনের অভ্যাস। আমরা অন্যকে অপমান করে যদি সন্তানের সামনে নিজেদের শক্তিশালী প্রমাণ করি, পরে তাকে বিনয়ী হওয়ার বক্তৃতা দিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক পৃথিবী। একটি ছোট মোবাইল ফোনের পর্দায় এখন ভোগ, প্রদর্শন, তুলনা, হিংসা, অপমান এবং সহিংসতার দৃশ্য শিশু-কিশোরদের সামনে হাজির। কার ফোন কত দামি, কার পোশাক কী ব্র্যান্ডের, কে কতটা ‘কুল’– এসবও অল্প বয়সে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি এখানে অপরাধী নয়; কিন্তু মূল্যবোধের ভিত দুর্বল হলে এই প্রদর্শনের পৃথিবী লোভ ও অস্থিরতাকে উস্কে দিতে পারে।

আমরা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছি। অন্যকে সম্মান দেখানোটাকে নিজের জন্য অসম্মানজনক মনে করছি। অপরাধ জেনেও তাতে লিপ্ত হচ্ছি। চুরি-ছিনতাই-খুনের মতো অপরাধ দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। শক্তি দিয়ে জেতার এ প্রবণতা সমাজ ও দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে একটুও ভাবছি না।
অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার অবশ্যই চাই। কিন্তু সেই বিচার আমাদের একটি ঘটনার সমাপ্তি দিতে পারে; আমাদের সামাজিক দায়ের মীমাংসা করতে পারে না।
আমাদের প্রশ্ন করতে হবে– আমরা কেমন প্রজন্ম তৈরি করছি? তাদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়ার আগে হৃদয়ে সহমর্মিতা পৌঁছাতে পারছি তো! তাদের সফল হওয়ার পথ দেখানোর পাশাপাশি মানুষ হওয়ার পথটাও দেখাচ্ছি তো!

অপ্রতিম আর ফিরবে না। একটি পরিবারের কাছে এই একটি বাক্যের ভার কতটা, তা বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। কিছুদিন পর সংবাদমাধ্যমে নতুন খবর আসবে, আমরা নতুন আলোচনায় চলে যাব। কিন্তু একটি ঘরে অপ্রতিমের অনুপস্থিতি প্রতিদিন নতুন করেই অনুভূত হবে।
অপ্রতিম, তোমার কোনো দায় ছিল না। তোমাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব ছিল আমাদের। আমরা পারিনি। আমাদের তুমি ক্ষমা কোরো না।

সোহেল নওরোজ, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা
[email protected]

আরও পড়ুন

×