সুশাসন
পুরাতনের জায়গায় গড়ে উঠছে নতুন ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন প্রবীণ শুভানুধ্যায়ী সেদিন প্রশ্ন রাখলেন– কেন আমরা সমাজকে জোরে ধাক্কা দিতে পারছি না? সমাজে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বিদ্রোহী হচ্ছি না, যতক্ষণ কোনো কিছু আমাদের নিজের গায়ে এসে না পড়ে; যতক্ষণ সমাজে আমাদের নিকটাত্মীয় কেউ উপেক্ষিত বা লাঞ্ছিত না হয়। তাঁর ভাষায়, আমরা একটা জায়গায় এসে আটকে যাচ্ছি– হয় দল, নয়তো আত্মীয়-পরিজন বা বন্ধুবান্ধবের পর্যায়ে। এর ঊর্ধ্বে আমরা উঠব কীভাবে? কোন কোন জাতি এর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে, ভেবে দেখা দরকার।
অনেকে বলেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। আমরা তো অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভালোই আছি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি একটি চক্রে আটকে যাচ্ছি? সাময়িক সাফল্যের চক্রে? একটি দেশের অগ্রগতি শুধু বড় অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয় দিয়ে মাপা যায় না। নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। এই জায়গাগুলো দুর্বল থাকলে উন্নয়নের অনেক অর্জনই শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে না। আস্থার সংকটও তৈরি হয়।
একটি দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ– সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম। এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারগুলো যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার জন্য যেসব কাজ করে, সেগুলো আমাদের সেই চক্র থেকে বেরিয়ে সম্মানিত জাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে দিচ্ছে না। ফলে তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। তারা বিরোধী দলকে পছন্দ করছে না, আবার সরকারি দলের অন্যায় ও দুর্নীতিরও সমালোচনা করছে। কিন্তু তারা অন্তত একজনকে বেছে নিচ্ছে। যে আনন্দঘন ও সম্মানজনক পরিবেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের বরণ করে নেওয়ার কথা, আমরা তা তৈরি করতে পারছি না। রাজনৈতিক দলগুলো কি সবসময় জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে?
যেমন, কোটা প্রথা বহু পুরোনো বিষয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন এক পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হওয়ার পরও বিষয়টির স্থায়ী সমাধান হয়েছে বলে আমরা দাবি করতে পারছি না। গণপরিবহনও বড় সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে শুনছি, মালিকদের কারণে ঢাকার যানবাহন ব্যবস্থাকে উন্নত করা যাচ্ছে না। ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সামষ্টিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আগের সরকারের আমলে শুনেছিলাম, যানবাহন ব্যবস্থা একজন এমপি নিয়ন্ত্রণ করেন। এখন শুনছি, আরেকজন এমপি করছেন। অর্থাৎ আমরা এক হাত থেকে আরেক হাতে যাচ্ছি। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের জিনিস চুরি, সময়মতো ব্যাগ না পাওয়া এবং বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। আধুনিকায়নের পরও নানা কাজে ঘুরতে হয়।
আমাদের বড় সমস্যা ‘ইন্টারেস্ট গ্রুপ’। এটি ভাঙতে পারছি না। পুরাতন ইন্টারেস্ট গ্রুপের জায়গায় গড়ে উঠছে নতুন ইন্টারেস্ট গ্রুপ। অনেকেই প্রশ্ন করেন– আসলে দেশটা কে চালায়? আগের আমলে ব্যক্তিগতভাবে যত এমপি, মন্ত্রী ও সরকার-সমর্থককে চিনতাম, তারা প্রায় সবাই বলেছেন, কোটা আন্দোলন আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়া যেত। তারা এটাও বলেছেন, যানবাহন ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না; চালকদের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়; মানুষকে জিম্মি করা বন্ধ করতে হবে। পোর্ট ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতেই হবে। কিন্তু আমরা ছোট ছোট স্বার্থের জন্য বড় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছি। বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে; মাস্তানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না।
এগুলো নাগরিকের প্রতিদিনের জীবন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাজনীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বড় বড় বিষয়। এগুলো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু মানুষ একই সঙ্গে চাঁদাবাজির শিকার হতে চায় না। গ্রিসের তরুণরা শপথ নিত– তারা যে গ্রিসে জন্মেছে, তার চেয়ে উন্নত গ্রিস নির্মাণের চেষ্টা করবে। আমাদের সংসদ সদস্য, রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান, আইন-আদালতের কর্তাব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা কার কাছে? সরকার বদলেছে, বদলাচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের গ্রামে পাঠাতে পারছি না; বেতন বাড়িয়েও ধরে রাখতে পারছি না। স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের বড় অংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। একটি ডেথ সার্টিফিকেট পেতেও অনেক সময় লাগে। এ সবের জন্য তো মানুষ রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেনি।

শিক্ষকরাও শিক্ষার কাজ বাদ দিয়ে রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন– এমন ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য জবাবদিহি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাস্টার্সের পর উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার প্রবণতা কমছে; স্থানীয়ভাবে পিএইচডি বা আশপাশের দেশ থেকে ডিগ্রি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু উন্নত দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার সংখ্যা কমছে।
এই জবাবহীনতা, পরিবহন ব্যবস্থার অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে কবে? শহরের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও গ্রামের অবস্থা খুব খারাপ। সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণও সবসময় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের উপযুক্ত আচরণ হয়ে উঠছে না।
এগ্রো ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারের দুই সন্তান, যারা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি সময় কে দেন। তারা বললেন, তারা ব্যবসায় সময় দেন। আর তাদের বাবা সবচেয়ে বেশি সময় দেন ব্যবসার ‘অকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করার জন্য, যাতে ব্যবসা করতে গিয়ে চাঁদাবাজি, পরিবহন মালিকদের চাপ ও পণ্য পরিবহনে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে না হয়।
এখন প্রচুর ‘পিআর’ হচ্ছে। এতে বিপুল বিনিয়োগও হচ্ছে। সবাই টেলিভিশনে মুখ দেখাতে উৎসাহী। যে কাজ রাজনৈতিক দলগুলোর করার কথা, তা অনেক রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের প্রধান করছেন। রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কেন নেতা হতে হবে?
আমাদের ছোটবেলায় সিলেটে একজন জেলা জজ ছিলেন; পাকিস্তান আমলের কথা। তিনি যেদিন রায় দিতেন, সেদিন রিকশায়ও চড়তেন না। বলতেন, রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হলে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যেতে পারেন। সেই জজের উত্তরসূরিরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছেন। তার প্রতি আমাদের ন্যূনতম দায়বদ্ধতাও কি পালন করতে পারছি?
মুক্তিযুদ্ধের আগে আমরা পরাধীনতার খাঁচায় ছিলাম; এখন অন্য খাঁচায় বন্দি হয়ে যাচ্ছি। সরকারের সঙ্গে থাকতে হবে; রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বড় ঋণ নিতে হবে; ব্যবসা করতে হবে; ঋণখেলাপি হতে হবে; সংস্কৃতি না বুঝলেও পৃষ্ঠপোষকতার ভাব করতে হবে; ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সাক্ষাৎ করতে যেতে হবে– এমন মনোভাব দেখা যাচ্ছে। আমরা কি এই বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম? সামনে হয়তো আরও নতুন নতুন প্রশ্ন ও পরিস্থিতি আসতে থাকবে। তাই তালা নয়; খুঁজতে হবে চাবি।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ