ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষা ব্যবস্থা

চাকরিতে মৌখিক নম্বর বৃদ্ধি কিংবা বৈষম্যে পুষ্টি জোগানো

চাকরিতে মৌখিক নম্বর বৃদ্ধি কিংবা বৈষম্যে পুষ্টি জোগানো
×

হাসিনুর রহমান খান

হাসিনুর রহমান খান

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী কিছু গ্রেডে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এমনকি ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ২৫ নম্বর রাখার কথাও এসেছে। সরকারের যুক্তি, শুধু লিখিত পরীক্ষার ফল দিয়ে প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা বোঝা যায় না; দক্ষ ও উপযুক্ত জনবল বাছাইয়ে ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ ক্ষমতা ও ব্যবহারিক সক্ষমতাও যাচাই করা দরকার। তবে সরকারের এ ভাবনা বিতর্ক এড়াতে পারছে না।

চাকরিপ্রার্থীর মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয় অস্বীকারের উপায় নেই। লিখিত পরীক্ষা প্রধানত জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, ভাষা ও সমস্যা সমাধানের কিছু দিক যাচাই করে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তার কাজ শুধু পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখা নয়। তাঁকে মানুষের সঙ্গে কথা বলা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, চাপের মধ্যে কাজ করা, দ্বন্দ্ব সামলানো, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং কখনও কখনও জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হয়। একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অসাধারণ হতে পারেন। বাস্তব পরিস্থিতিতে তাঁর যোগাযোগ ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বা আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা (ইন্টারপারসোনাল স্কিল) দুর্বল হতে পারে। আবার লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া কোনো প্রার্থীর মধ্যে নেতৃত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা অসাধারণ হতে পারে। সুতরাং, মৌখিক বা আচরণভিত্তিক মূল্যায়ন বাদ দেওয়ার যুক্তি নেই। 

কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে দিলেই কি চাকরিপ্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে? বিতর্কটা সম্ভবত এ কারণেই। এখানে কে কত নম্বর পাচ্ছেন; তাতে মানুষের যতটা আগ্রহ, তার চেয়েও বেশি আগ্রহ পরীক্ষাটা কে নিচ্ছেন, কীভাবে নিচ্ছেন, কী মাপছেন এবং সেই নম্বর দেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা যাচাইযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রগাঢ়– এসব বিষয়ের প্রতি।

উন্নত দেশের সরকারি নিয়োগব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশ্নটি সেখানে শুধু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর নয়। বরং কাজটির জন্য কোন যোগ্যতা প্রয়োজন এবং তা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে মাপা পদ্ধতি নিয়ে।

যুক্তরাজ্যের সিভিল সার্ভিসে একজন প্রার্থীকে শুধু একটি মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে বিচার করা হয় না। সামর্থ্য (অ্যাবিলিটি), কারিগরি দক্ষতা (টেকনিক্যাল স্কিল), আচরণ (বিহেভিয়ার), শক্তিমত্তা (স্ট্রেংথ) ও অভিজ্ঞতা (এক্সপেরিয়েন্স)– এই পাঁচ বিষয়ের সমন্বয় করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন, প্রাসঙ্গিক ভূমিকা পালন, পরিস্থিতি সম্পর্কিত বিচারধারা, মূল্যায়ন ও সাক্ষাৎকার ব্যবহার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নিয়োগে স্ট্রাকচার্ড সাক্ষাৎকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে সব প্রার্থীকে একই পূর্বনির্ধারিত প্রশ্ন, একই রেটিং মাপকাঠি ব্যবহার এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর বা যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি আগে থেকে নির্ধারণ করার মতো পদ্ধতি ব্যবহারের সুপারিশ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার– সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের জায়গা সংকুচিত করা। আমাদের দেশেও সরকারি একটি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় এমন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে।

ভারতের কেন্দ্রীয় বা ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসে ব্যক্তিত্বের পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মূল লিখিত পরীক্ষার ১৭৫০ নম্বরের সঙ্গে এ জন্য ২৭৫ নম্বর যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত মেধাক্রম নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ মৌখিক মূল্যায়ন আছে এবং তা গুরুত্বপূর্ণও। কিন্তু লিখিত পরীক্ষার তুলনায় সেটি সীমিত গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারি চাকরি শুধু একটি পেশা নয়। বিপুলসংখ্যক তরুণের কাছে এটি সামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান পথ। বিসিএসের বাইরেও একটি পদের বিপরীতে অসংখ্য প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেন। ফলে মাত্র কয়েক নম্বরের ব্যবধান একজন মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। পরাজিত প্রার্থী এবং সমাজের কাছে প্রশ্ন থেকেই যাবে– জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর ব্যবধানটি যোগ্যতার, নাকি ব্যক্তিগত বিবেচনার। 

২০২৪ সালে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়। এর পেছনে অন্যতম যুক্তি ছিল– নিয়োগে অনিয়মের সুযোগ কমানো এবং প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা। ২০২৬ সালেও সরকার সংসদে জানিয়েছে, বিসিএসে ১০০ নম্বরের ভাইভা বহাল থাকবে। তাহলে একই রাষ্ট্র ১১ থেকে ২০ গ্রেডের চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার ওজন বাড়ানোর কথা ভাবছে কেন? বিসিএসে যা অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ায়, তা অন্য সরকারি চাকরিতে একই ঝুঁকি কেন বাড়বে না– এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছাড়া নতুন ব্যবস্থায়য় জনআস্থা অর্জন করা কঠিন হবে। মৌখিকে নম্বর বাড়িয়ে দিলেই এর সমাধান হবে না বরং সমাধান হতে পারে গতানুগতিক পরীক্ষা পদ্ধতি রূপান্তর করার মাধ্যমে।

প্রথমত, প্রতিটি পদের জন্য আগে থেকেই যোগ্যতার কাঠামো তৈরি করতে হবে। যেমন, যোগাযোগ ক্ষমতায় ৫, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতায় ৫, চাকরি সম্পর্কিত জ্ঞানে ৫, নৈতিক বিচারে ৫ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় ৫। বোর্ডের সদস্য ইচ্ছামতো নম্বর দিতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, সব প্রার্থী হুবহু একই প্রশ্ন না পেলেও প্রশ্নের কঠিনতা এবং যোগ্যতার ক্ষেত্র সমমানের হতে হবে। তৃতীয়ত, বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যকে প্রথমে স্বাধীনভাবে নম্বর দিতে হবে। পরে গড় অনুযায়ী চূড়ান্ত নম্বর হবে। একজন প্রভাবশালী সদস্যের মতামত যেন পুরো বোর্ডের নম্বর হয়ে না যায়। চতুর্থত, সম্ভব হলে ইন্টারভিউ বোর্ডের কাছে প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার নম্বর গোপন রাখা উচিত। এতে ‘এই প্রার্থী আগে থেকেই এগিয়ে’ বা ‘এই প্রার্থীকে তুলতে হবে’ এ ধরনের মানসিকতা কমতে পারে।
পঞ্চমত, ভাইভা রেকর্ড করার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। রেকর্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু গুরুতর অভিযোগ বা প্রশাসনিক রিভিউয়ের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। ষষ্ঠত, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর আলাদাভাবে প্রকাশ করা উচিত। 

আমাদের প্রার্থী সম্পর্কে ধারণাগত পরিবর্তনও প্রয়োজন। একজন ইন্ট্রোভার্ট প্রার্থী কম দক্ষ কর্মকর্তা হবেন– এমন কোনো নিয়ম নেই। সুন্দরভাবে ইংরেজি বলতে পারা মানেই প্রশাসনিক দক্ষতা নয়। দ্রুত উত্তর দিতে পারা মানেই ভালো বিচার ক্ষমতা নয়। আবার নার্ভাস হওয়া মানেই অযোগ্যতা নয়। 
সরকার যদি সত্যিই দক্ষ জনবল চায়, তাহলে একজন প্রার্থী ‘কী জানেন’ এবং ‘কী করতে পারেন’– দুটিই জানার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত বা অন্য কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করতে হবে না। যে সমাজে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহের ইতিহাস আছে, সেখানে ধারণাগত (সাবজেকটিভ) উপাদানের ওয়েট বাড়ানোর আগে বস্তুনিষ্ঠ রক্ষাকবচ (অবজেক্টিভ সেফগার্ড) কয়েক গুণ শক্তিশালী করা প্রয়োজন। লিখিত পরীক্ষাগুলো কতটা বস্তুনিষ্ঠ রক্ষাকবচ মেনে চলছে, সেটিও বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে তা সংশোধন করা উচিত।

ড. হাসিনুর রহমান খান: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×