ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি খাত

আমদানিনির্ভরতা আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে

আমদানিনির্ভরতা আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও রান্নাঘরে সেটা এখনও কম পরিলক্ষিত। মূল প্রচেষ্টা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ বাড়ানো। সার কারখানাগুলোও যথাসম্ভব চালু রাখা প্রয়োজন। তাতেও চাই গ্যাস।

গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর আমরা আসলে গ্যাসভিত্তিক বাংলাদেশই গড়তে চেয়েছিলাম। একটা সময় পর্যন্ত এর সংকটও ছিল না। তবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরবরাহ কমতে থাকার পর গ্যাস আমদানি-নির্ভরশীল হয়ে পড়াটা ছিল বিপজ্জনক। কতটা বিপজ্জনক, সেটা ইউক্রেন যুদ্ধের সময় টের পাওয়া গিয়েছিল। হালে ইরান যুদ্ধে তা আরও বেশি অনুভূত।

গ্যাস সরবরাহে ইতোমধ্যে যেটুক উন্নতি হয়েছে, তা অভ্যন্তর ভাগ থেকে সরবরাহ বাড়ার কারণে নয়। দুর্ঘটনায় বসে যাওয়া একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্রমে কাজে ফেরায়। এরই মধ্যে আবার কার্গো থেকে টার্মিনালে জ্বালানি স্থানান্তরে জটিলতা দেখা দেওয়ায় কমে যায় গ্যাস সরবরাহ। চাপ গিয়ে পড়ে গ্যাস ব্যবহারকারী প্রতিটি খাতে।

রান্নাবান্নায় পাইপলাইনের গ্যাসে অনিশ্চয়তা নিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত অনেক পরিবার এরই মধ্যে বিকল্প জ্বালানি, বিশেষত এলপিজি ব্যবহার শুরু করেছে। এর চাহিদা বেড়েছে যানবাহন আর শিল্পেও। এরই মধ্যে চলতি মাসে এলপিজি আমদানি ২৫ শতাংশ কমার খবর মিলল।

নিবন্ধটি প্রকাশ হতে হতে এলপিজির দাম বাড়ানোর খবর মিলতে পারে। বাজারে প্রথমত এলপিজি সহজে মিলছে না। মিললেও ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এর দাম মাঝে কিছুটা কমানোয় কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেয়েছিল ব্যবহারকারীরা।

এলপিজি ব্যবহারকারী বাড়তে বাড়তে নাকি এক কোটি হয়েছে। গ্রামেও অনেকে এলপিজি ব্যবহারে অভ্যস্ত। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যবসাটা করছিল গুছিয়ে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে বাজার হয়ে উঠেছে অস্থির।

হরমুজের পর বাব-আল মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজির উপকরণ সরবরাহ বিঘ্নিত। বেড়েছে সামগ্রিক পরিবহন ব্যয়, উপকরণের দাম; কমেছে আমদানি। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এলপিজি আমদানিকারকরা অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন জ্বালানিমন্ত্রীকে। কিন্তু যাদের বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে, তারা আশ্বস্ত হবেন কীভাবে? তাদের অনেকে কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিরও খবর রাখছেন।

নিবন্ধটি রচনাকালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারির খবর রয়েছে। পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হলে মহেশখালীতে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনাল কতটা ঠিকমতো কাজ করতে পারবে, কে জানে! বর্তমান সরকার বাড়তে থাকা গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আরও তিনটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমদানিনির্ভর গ্যাস কাঠামো থেকে এখন চট করে বেরোনোর সুযোগ নেই। তাই সেটাকেই শক্তিশালী করার এই প্রয়াসে বিশেষজ্ঞরা ‘হ্যাঁ’ বলছেন। কর্মরত দুটি টার্মিনালের একটি বেঁকে বসলেও কী পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়, সেটা ইতোমধ্যে জানা। প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দুম করে কমে যায় একটি টার্মিনাল বিকল হয়ে পড়লে।

গ্যাসের প্রদর্শিত চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সবকিছু ঠিক থাকলে মিলছে বড়জোর ২৮০ কোটি ঘনফুট। এ অবস্থায় ৫০ কোটি ঘনফুট নেই হয়ে গেলে কী দাঁড়ায় পরিস্থিতি!
চালু গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে সরবরাহ কমছে ২০১৭ সাল থেকে। এর মধ্যে ভোলায় কিছু গ্যাস মিলেছে, যা মূল ক্ষেত্রগুলোয় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। চলমান কূপ খনন কার্যক্রম থেকে কিছু গ্যাস অবশ্য যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডে। তাতে ‘ঘা’ শুকাচ্ছে না। ভোলার গ্যাস ভোলাতেই ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা; সেখান বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা গড়ে তুলে। 
গ্যাসের অভাবে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার কোনোটাই ঠিকমতো চালাতে পারছি না। কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হয়েছে এর মধ্যে। সার আমদানিও বাড়ছে। বেশি দূরে নেই উপকরণনির্ভর বোরো মৌসুম। এতে সেচের সঙ্গে অনেক বেশি সারও লাগবে।

এর মধ্যে যেভাবে হোক, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেছে; লোডশেডিং নিয়ে অভিযোগ কমেছে প্রধান বিদ্যুৎ গ্রাহকদের। তবে আবহাওয়ার খামখেয়ালিতে এখনও গরম কাটেনি বলে কমেনি বিদ্যুতের চাহিদা। সমকালের সিলেট ব্যুরো থেকে পরিবেশিত খবরে লোডশেডিংয়ে জনভোগান্তির বর্ণনা রয়েছে।

এদিকে নভেম্বর পর্যন্ত ‘কাতার এনার্জি’ যাদের এলএনজি জোগাতে পারবে না, সেই তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম। তারা ছিল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আমাদের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার খবর রয়েছে। তাতে আমাদের বিকল্প উৎসের খোঁজ করতে হচ্ছে।
অনেক জ্বালানি আমদানিকারক দেশেরই এই অবস্থা। তাতে এলএনজির দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় তিন গুণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সুদূর আমেরিকা থেকে এলএনজিবাহী কার্গো আসছে মহেশখালীতে। তাদের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়েছে; ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আনার। কেউ কেউ যুক্তি জোগাবেন, দাম বেশি পড়লেও আমেরিকা থেকে সরবরাহ তো নিশ্চিত!

অস্থির আর অনিশ্চিত দুনিয়ায় কোনো কিছুই আসলে শতভাগ নিশ্চিত নয়– ইরান যুদ্ধ সেটা আরও বেশি করে দেখিয়ে দিল। কাতার আর ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি করে আমরা তো নিশ্চিন্তেই ছিলাম। কে জানত, সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ইরানের পাল্টা আঘাতে কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় এত বড় ধস নামবে!
কাতার ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। আর কিছু লাগে না; এক কাতারের সরবরাহ কমে গেলেই গ্যাসের বাজার অস্থির। সেই বাজার থেকে কাড়াকাড়ি করে এলএনজি আনতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা বাংলাদেশের। একই সঙ্গে অর্থ সংকটও তীব্র। যাদের আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তারা নাকি এই সংকটের মধ্যে আগেভাগেই কিনে রেখেছে এলএনজি। পশ্চিমা দেশগুলোয় তীব্র শীতকাল আসতে দেরি নেই। তাদের ঘরবাড়ি গরম রাখতে লাগবে অনেক গ্যাস। সেই গ্যাসে কতটা ভাগ বসাতে পারব আমরা?

এর মধ্যে খবর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম আনার কাজ ব্যাহত হয়েছে পাকিস্তান আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায়। সেই জটিলতা পেরিয়ে কাজটি সম্পন্ন হতে হয়তো সময় লাগবে না। কিন্তু ২৪শ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ব্যয়বহুল কেন্দ্রে উৎপাদন স্থিতিশীলভাবে শুরু হতে আরও সময় লাগবে। ততদিনে আমরা আবারও পড়ব লোডশেডিংয়ে।
আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত গ্যাসনির্ভর। শিল্পের চাইতে এতে গ্যাসের ব্যবহার বেশি। উল্টোটাই বরং ছিল স্বাভাবিক। বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেও শিল্পে এর সরবরাহ বাড়ানো যায়নি। এক গ্যাসের অভাবেই শিল্পে বিনিয়োগ এখন স্থবির। এর প্রভাব রয়েছে কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলায়।

আর সংকটের গভীরে আছে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা। গ্যাস তো তাও কিছুটা উৎপাদন করি। তরল জ্বালানির প্রায় পুরোটাই করতে হয় আমদানি। ‘ক্লিন এনার্জি’ বলে বিবেচিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে ইউরেনিয়ামও আমদানি করতে হবে ধাপে ধাপে। কে জানে, সেটা ঘিরে আবার ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় পড়তে হয় কিনা! 

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×