সহজিয়া
ইতিহাসের কোন পাশে দাঁড়াবে বাংলাদেশ?
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ এখন এমন প্রশ্নের মুখোমুখি, যা কেবল কোনো প্রতিরক্ষা জোটের প্রশ্নে সীমিত নয়; ইতিহাসের কোন পাশে দাঁড়াতে চাই আমরা? আমার কাছে উত্তর অস্পষ্ট নয়।
এই প্রশ্নের জন্ম হয়েছে ইরান ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে। বহুগুণ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যে পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থার কাছে নিজের সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ সমর্পণ করতে ইরানের অস্বীকৃতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, যে ব্যবস্থা আইন, নিরাপত্তা ও সভ্যতার কথা অবিরাম বলে, অথচ ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন ও ভূমি ধ্বংস হতে দেয়। রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সৌদি আরব ও পাকিস্তান সেই ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ কোন পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়? বাংলাদেশকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি সৎভাবে দাঁড়াতেই হবে।
বিষয়টি কেবল ইসরায়েল বনাম ফিলিস্তিন, ইরান বনাম সৌদি আরব কিংবা সুন্নি বনাম শিয়া নয়। এসব সংঘাতের গভীরে রয়েছে আরও পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো; বিপুল সম্পদ, সামরিক শক্তি, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ অতি অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে, আর সাধারণ মানুষকে তার পরিণতি মেনে নিতে হবে। রাজতন্ত্র সেই কাঠামোরই একটি অংশ। ঔপনিবেশিকতাও সেই কাঠামোর অংশ ছিল। আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থাও সেই কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে।
মনে রাখতে হবে– মক্কা পবিত্র ভূমি; কিন্তু সৌদি রাজতন্ত্র পবিত্র নয়।
কাবা শরিফ বিশ্বের মুসলমানদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের কেন্দ্র। কিন্তু যে রাষ্ট্র এখন কাবা শরিফ পরিচালনা করে, তার পররাষ্ট্রনীতি মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের অংশ নয়। পার্থক্যটি অত্যন্ত মৌলিক। বাংলাদেশের উচিত আরও সতর্ক থাকা– মক্কার পবিত্র ভূমি নিয়ে আবেগ যেন সৌদি আরবের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ না হয়।
প্রশ্নটি এই নয়– বিদ্যমান সংঘাতে যুক্ত রাষ্ট্রগুলো মুসলিম কিনা। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কার হাতে, কার স্বার্থ সুরক্ষিত, কার সম্পদ নিয়ন্ত্রিত, কার যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধে পরিণত হতে পারে; এবং বাংলাদেশ ‘না’ বলার অধিকার ধরে রাখতে পারবে কিনা।
এটাও অনিবার্য অবস্থান হওয়া উচিত– ইরানের সম্পদ ইরানেরই। যে কোনো দেশের তেল-গ্যাস, খনিজ, ভূমি ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান শুধু এই কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম্পত্তিতে পরিণত হয় না যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দেশটির সরকারকে অপছন্দ করে।
যে আন্তর্জাতিক নীতি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে নির্ধারণের অধিকার দেয়– অন্য কোনো দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব কখন বৈধ আর কখন অবৈধ– তা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হুমকির মুখে ফেলবে।
বাংলাদেশের খুব ভালোভাবে বোঝা উচিত: সার্বভৌমত্ব কেবল জিডিপি, সামরিক ব্যয় বা শক্তিশালী দেশগুলোর অনুমোদন দিয়ে পরিমাপ করা হয় না। ভূগোল ও ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ। চাপ সহ্য করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি প্রতিরোধ করার অধিকার নিজের বলে বিশ্বাস করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার গুরুত্ব তার আকারের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা বঙ্গোপসাগরের পাশে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে, বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত করিডোরের কাছাকাছি অবস্থান করছি। তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়: কোন শক্তিশালী জোট আমাদের রক্ষা করবে?
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত বাংলাদেশকে কীভাবে এতটা স্থিতিস্থাপক করে তোলা যায়, যাতে কোনো শক্তিশালী পক্ষ সহজে আমাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে না পারে? এখান থেকেই কিছু অত্যন্ত বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে আমরা কি নিজেদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে পারব? আমাদের জ্বালানি মজুত কতদিন টিকে থাকবে? আমদানি করা জ্বালানির ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা নির্ভরশীল?
প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কত কৃষিজমি হারাচ্ছি? আমাদের বীজের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? আমাদের পানি কতটা নিরাপদ? অত্যাবশ্যক শিল্পগুলো আমদানি করা উপকরণের ওপর কতটা নির্ভরশীল? গ্রামগুলো কি নিজেদের খাদ্য ও জ্বালানির আরও বেশি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারে? সম্পূর্ণভাবে বিশাল কেন্দ্রীভূত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ কি বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে?
পুকুর, জলাভূমি, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিকে কি আমরা জাতীয় নিরাপত্তার সম্পদ হিসেবে রক্ষা করতে পারি? আমরা কি জরুরি খাদ্যের মজুত গড়ে তুলতে পারি? কোনো একক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কি আমরা আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি? সামরিক জোটের তুলনায় এসব প্রশ্ন হয়তো কম আকর্ষণীয় শোনায়। বাস্তবে এগুলোই জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্ন।
যে দেশ নিজেকে খাওয়াতে পারে না, সে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে অচল হয়ে যেতে পারে, সে ঝুঁকিপূর্ণ। যে দেশ নিজের বীজ সংরক্ষণ করতে পারে না, সে ঝুঁকিপূর্ণ। যে দেশের রাজনৈতিক কল্পনা ও আত্মবিশ্বাস ওয়াশিংটন, রিয়াদ, দিল্লি, বেইজিং বা ইসলামাবাদের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল, সে ঝুঁকিপূর্ণ। আর যে দেশ নিজের ধর্মকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে, সে আরও গভীরভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, আরবে সৌদি রাজবংশ ক্ষমতা গ্রহণের বহু শতাব্দী আগে থেকেই বাংলায় ইসলাম ছিল। আলেম, সুফি, পীর, ফকির, মসজিদ, মাজার, কবিতা, সংগীত, ফারসি প্রভাবিত বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এটি এখানে বিকশিত হয়েছে। ইসলাম বাংলার সঙ্গে মিশেছে এবং বাংলার মাটিতে শিকড় গেড়েছে।
আমি বিশ্বাস করি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ যদি সৌদি রাজতন্ত্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার পথ বেছে নেয়, তা হবে এক গভীর ঐতিহাসিক ভুল। এক দল শক্তিশালী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বদলে আরেক দল শক্তিশালী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া বাংলাদেশের প্রয়োজন নয়। সার্বভৌমত্বের উদ্দেশ্য ‘ভালো প্রভু’ খুঁজে বের করা হয়; উদ্দেশ্য হলো, কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রভুর প্রয়োজনই যেন না থাকে।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- আনুশেহ আনাদিল