ইসলাম ও সমাজ
পিতামাতার বার্ধক্য, সন্তানের ব্যস্ততা এবং দায়িত্ববোধের পরীক্ষা
তোফায়েল আহমাদ মাক্কী
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলোর ঋণ কোনোদিন পুরোপুরি শোধ করা যায় না। কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আগেই আমরা তাদের কাছে ঋণী হয়ে যাই। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই যারা আমাদের জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। আমরা কথা বলতে শেখার আগেই যারা আমাদের কান্নার ভাষা বুঝেছেন; আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখার আগেই যারা আমাদের হাত ধরে পথ চলতে শিখিয়েছেন। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য যারা নিজেদের সকল চাওয়া-পাওয়া ভুলে গেছেন, সেই মানুষরা হলেন আমাদের পিতা ও মাতা।
শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে কিছুই দিতে পারে না; সে শুধু নিতে জানে। মায়ের বুকের দুধ নেয়, বাবার উপার্জন নেয়, তাদের সময় নেয়, ঘুম কেড়ে নেয়, চিন্তা বাড়ায়, অথচ বিনিময়ে কিছুই দিতে পারে না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিন সময় বদলে যায়। সন্তান বড় হয়। পড়াশোনা শেষ করে, চাকরি করে, সংসার করে, নিজের বাড়ি হয়, নিজের গাড়ি হয়, নিজের সন্তান হয়। আর সেই সময়ে পিতামাতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করেন।
যে হাত একদিন সন্তানকে হাঁটতে শিখিয়েছিল, সেই হাত এখন লাঠি খোঁজে। যে চোখ একদিন সন্তানকে ঘিরে সুখের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত, সেই চোখ আজ শুধু সন্তানের মুখটি একবার দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। যে পা একদিন সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে অবিরাম ছুটে চলেছিল, সেই পা আজ বার্ধক্যের ভারে থেমে গেছে– অপেক্ষা শুধু সন্তানের একটু কাছে আসার। আর তখনই শুরু হয় সন্তানের দায়িত্ববোধের আসল পরীক্ষা।
দুই.
পিতামাতার মর্যাদা বোঝার জন্য এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে যে আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরেই পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণের কথা বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমার রব আদেশ করেছেন– তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো” (সুরা আল-ইসরা: ২৩)।
খেয়াল করুন, আল্লাহ তায়ালা শুধু পিতামাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহারের কথা বলেননি; বরং বিশেষভাবে বলেছেন, ‘তারা যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়।’ বার্ধক্যের কথা কেন বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলো? কারণ পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তাদের বার্ধক্যের সময়ে।
শিশু একই কথা দশবার বললে আমরা হাসি; কিন্তু বৃদ্ধ বাবা একই কথা দশবার বললে আমরা বিরক্ত হই। শিশু ধীরে হাঁটলে আমরা তার হাত ধরি; কিন্তু বৃদ্ধ বাবা ধীরে হাঁটলে আমরা বিরক্ত হয়ে বলি, ‘আব্বা, একটু তাড়াতাড়ি হাঁটেন!’ অথচ শৈশবে যখন তারা আমাদের দুর্বলতা সহ্য করেছিলেন, তখন তারা আমাদের প্রতি বিরক্ত হননি। আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমরা কি তাদের সঙ্গে সেই ধৈর্য দেখাতে পারছি, যে ধৈর্য তারা আমাদের সঙ্গে দেখিয়েছিলেন?
সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা হচ্ছে পিতামাতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েও জান্নাত নিশ্চিত করতে না পারা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন– ‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক।’ সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে, হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতামাতা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে বার্ধক্যে পেল, অথচ তাদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)।
কী আশ্চর্য! মানুষ জান্নাতের সন্ধানে কত কষ্ট করে, কত দূরে দূরে যায়। কেউ তাহাজ্জুদ পড়ে, কেউ নফল রোজা রাখে, কেউ দান করে, কেউ হজ-উমরাহ করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার ঘরেই জান্নাতের দরজা খুলে রেখেছেন! সুতরাং বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের জন্য বোঝা নয়; বরং তার জান্নাত লাভের বিরাট মাধ্যম।
তিন.
সাধারণত সবাই পিতামাতার অধিকার আদায়ের দাবি করে থাকে। পিতামাতার অধিকার আসলে কী? আমরা অনেক সময় মনে করি, পিতামাতার ভরণপোষণের টাকা দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু পিতামাতার প্রয়োজন শুধু টাকা নয় বা তাদের অধিকার শুধু গতানুগতিক কিছু দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের অধিকার এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত এবং গভীর। আর এই অধিকার কোনো সামাজিক সৌজন্য বা পারিবারিক রীতির বিষয় মাত্র নয়; এগুলো আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত অধিকার।
পিতামাতার অন্যতম প্রধান অধিকার হচ্ছে সন্তানের পক্ষ থেকে সম্মানজনক আচরণ পাওয়া এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো” (সুরা আল-ইসরা: ২৩)। অর্থাৎ পিতামাতার প্রতি অবাধ্যতা শুধু তাদের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো অপরাধ করা বা প্রকাশ্যে অসম্মান করা নয়; কখনও একটি বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস, একটি বিরক্তিকর দৃষ্টি কিংবা সামান্য কঠিন একটি উত্তরও তাদের হৃদয়ে গভীর আঘাত করতে পারে।
সন্তান পিতামাতার সামনে বিনয়ী থাকাও তাদের অন্যতম অধিকার। তাদের সামনে এমন কোনো অহংকার প্রকাশ করা যাবে না, যাতে তারা মনে করেন– সন্তান এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই এখন আর সন্তানের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই। সুতরাং সন্তান যত বড় হোক, যত শিক্ষিত হোক, যত প্রতিষ্ঠিত হোক– পিতামাতার সামনে তার বিনয় কমে যাওয়া চলবে না। বরং বয়স ও যোগ্যতা যত বাড়বে, তাদের প্রতি সম্মান ও বিনয় তত গভীর হওয়া উচিত।
সন্তানের ওপর পিতামাতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো, তাদের একাকিত্বে সঙ্গ দেওয়া। কারণ সন্তানের অসহায়ত্বের সময় পিতামাতা তাকে একা থাকতে দেননি; বরং ভালোবাসা, মমতা ও নিরাপত্তার নিবিড় বন্ধনে তাকে আগলে রেখেছেন। শৈশবে তারা সন্তানের একাকিত্ব দূর করেছেন; বার্ধক্যে সন্তানের দায়িত্ব হলো তাদের একাকিত্ব দূর করা।
কিন্তু আধুনিক জীবনে বাস্তব পরিবর্তন ঘটেছে। কর্মসংস্থানের জন্য সন্তান অন্য শহরে থাকে, কখনও অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করছেন। সন্তানদের পড়াশোনা, কর্মজীবন, সামাজিক যোগাযোগ– সবকিছু মিলিয়ে জীবন ব্যস্ত। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ব্যস্ততা জীবনের বাস্তবতা হলেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না। দূরে থাকলেও ফোন করা যায়, ভিডিও কলে কথা বলা যায়, প্রয়োজনে আত্মীয় বা বিশ্বস্ত মানুষের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা যায়। তাদের যেন মনে না হয় ‘আমাদের সন্তানদের জীবনে এখন আর আমাদের কোনো জায়গা নেই।’
বর্তমান সমাজে পিতামাতার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়ে পড়েছে– সন্তানের মুখ থেকে তাদের জন্য দোয়া শোনার অধিকার। পিতামাতার জন্য দোয়া করা এমন নয় যে সময় পেলে করলাম, সময় না পেলে করলাম না। অথচ আল্লাহ তায়ালা সন্তানকে শুধু পিতামাতার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দেননি; বরং দোয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন– “আর বলো, ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন’।” (সুরা আল-ইসরা: ২৪)
একজন সন্তান হয়তো পিতামাতার সব অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে পারবে না; কিন্তু অন্তত তার হাত যখন আল্লাহর দরবারে উঠবে, তখন সেই হাত যেন পিতামাতার জন্যও ওঠে– এতটুকু অধিকার আদায়ে কোনো কৃতজ্ঞ সন্তান কার্পণ্য করতে পারে না। আমাদের প্রতিদিনের প্রশ্ন হওয়া উচিত– ‘আমি কি আজ পিতামাতার জন্য দোয়া করেছি?’
চার.
আমাদের মনে রাখা উচিত একদিন আমরাও বৃদ্ধ হবো। আজ আমরা আমাদের পিতামাতার সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, আমাদের সন্তানরা তা দেখছে, শুনছে এবং শিখছে। আজ আপনি আপনার বাবার হাত ধরেছেন, কাল আপনার সন্তান হয়তো আপনার হাত ধরবে। কিংবা আজ আপনি আপনার বাবাকে গালি দিয়েছেন, কাল হয়তো আপনার সন্তানও আপনাকে গালি দিতে কিঞ্চিৎ কুণ্ঠাবোধ করবে না।
তাই পিতামাতা জীবিত থাকলে আজই তাদের কাছে যান। তাদের হাত ধরুন। কপালে চুমু দিন। বলুন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যদি কখনও আপনাদের কষ্ট দিয়ে থাকি, আমাকে ক্ষমা করবেন।’ তাদের একটি দোয়া হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
আর যদি তারা দুনিয়াতে না থাকেন, তাদের জন্য দোয়া করুন, ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করুন, তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখুন এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিজের জীবনকে সৎ করুন। নিজেকে এমন সন্তান বানান, যার নেক আমলের কারণে পিতামাতার কবরে কল্যাণের দরজা খুলে যায়।
আমাদের পক্ষে পিতামাতার ঋণ কোনো দিনই শোধ করা সম্ভব নয়; কিন্তু তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন আমাদের অবহেলায় অন্ধকার না হয়– এই দায়িত্বটুকু আমরা অবশ্যই পালন করতে পারি। পিতামাতার প্রতি আমাদের অন্যান্য কর্তব্য পালনের পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও বলি– ‘রাব্বিরহাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সগিরা’।
তোফায়েল আহমাদ মাক্কী: লেকচারার (খণ্ডকালীন), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার