শিকড়ে ফেরা
গ্রাম বাঁচাতে পল্লি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান
মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাধীনতার পর আশির দশকে দেশজুড়ে চালু হয়েছিল গ্রাম পুনরুজ্জীবন আন্দোলন। রাজনীতিকরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করতেন, গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকবৃন্দ ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতেন, এই কৃষিপ্রধান দেশে সবার আগে দরকার পল্লি উন্নয়ন। পরীক্ষায় রচনা লিখতে দেওয়া হতো– ‘গ্রামে ফিরে যাও’। এই আন্দোলন কতটা সফল হয়েছে, তা সমাজবিজ্ঞানীরা বলবেন। তবে এ আন্দোলনের প্রভাবেই আজ গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ গেছে। বাড়ি বাড়ি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
আজকাল আর নৌকায় যোগাযোগের চল নেই। গ্রামে গ্রামে স্কুল-কলেজ হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রান্তিক কৃষকের সন্তানরা লেখাপড়া শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকাল কাউকে আর গ্রামে ফিরতে দেখা যায় না। ‘গ্রাম বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ স্লোগান আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
গ্রামে থেকে যারা পড়াশোনায় ভালো করে; পয়সা থাকলে তারা আর গ্রামে থাকতে চায় না। বড় শহর বা ঢাকায় চলে আসে। উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর দেশেই চাকরি পেলে তো ভালো; না পেলে সোজা আমেরিকা-ইউরোপের পথ ধরে। সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে গ্রামে কেন; দেশেই আর ফিরতে চায় না। টাকা-পয়সা হওয়ার পর তাদের কেউ কেউ এমনকি ভারত-পাকিস্তান-ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে বলে শোনা যায়, তবু দেশে ফেরার সাহস তাদের হয় না। যারা দেশে থাকে, তাদের কেউ কেউ গ্রামে যায় নির্বাচনের সময়। গ্রামের ভোটে মন্ত্রী হয়, এমপি হয়, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়। তাদের পরিবার থাকে ঢাকায়, সন্তানরা থাকে বিদেশে। কেন এমনটা হয়? গ্রাম কিংবা মফস্বল শহরেও আজ কেন থাকা যায় না– এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। গ্রামের মেধাবী অংশটিই যদি গ্রাম ছেড়ে দেয়, তবে গ্রাম বাঁচবে কেমন করে?
আগে মফস্বলের মানুষের হাতে পয়সা ছিল কম। তবে শহরের অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সুযোগের ফারাকও ছিল কম। আজকাল রাজনীতির খেলায় পড়ে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। উপজেলা সদরেও ডাক্তার থাকে না; ঠিকমতো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। টাকা-পয়সা নিয়ে শান্তিতে ঘুমানো যায় না; ব্যবসা করা যায় না। এ রকম পরিবেশে থাকা কঠিন। সুযোগ থাকলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে যাবেই। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে গ্রামে ফেরাতে চাইলে গ্রামের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সুযোগ বাড়াতে হবে। এই তিনটি বিষয়ই মানুষের মৌলিক চাহিদার মতো।
পড়াশোনায় যারা অতটা সুবিধা করতে পারে না, তাদের বেশির ভাগ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানও বড় বড় শহরের আশপাশে অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার জন্য হাজার হাজার শ্রমিক গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমাদের এখন সময় এসেছে শ্রমবাজারকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করার। গ্রামকে বাঁচাতে হলে গ্রামে থেকে অন্ন-বস্ত্র সংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের পরিকল্পিত উপায়ে এগিয়ে যেতে হবে। গত কয়েক দশকে গ্রামীণ সড়কের নেটওয়ার্ক বেশ উন্নত হয়েছে; বিদ্যুৎ সংযোগ বেশির ভাগ গ্রামে পৌঁছেছে। তাই গ্রামে গ্রামে হালকা ও মাঝারি আকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষ তার গ্রামে নিজ বাড়িতে থেকে শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
কৃষি ছাড়া গ্রামের মানুষের রোজগারের বড় উপায় হচ্ছে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ। আরেকটি অটোগাড়ি চালানো। এর কোনোটিই দক্ষ উৎপাদনশীল খাত নয়। মফস্বলের স্কুল-কলেজে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারলে উৎপাদনশীল খাতে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। এই দক্ষ জনশক্তি বিদেশে গেলে রেমিট্যান্স আসবে বেশি। আমাদের দেশের কর্মক্ষম অদক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশই থাকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
অনেকেই বলে থাকেন, তারা হলো টাকার মেশিন। তাদের কষ্টে উপার্জিত অর্থ দেশে তাদের স্বজনরা বিলাসী জীবন যাপনে খরচ করে ফেলেন। টাকা বিনিয়োগের পথ তাদের জানা নেই। কখনও কখনও নিরাপত্তার অভাবে এমন পরিবারও গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে বসবাস করে। কাজেই গ্রামের মানুষকে গ্রামে রাখতে হলে নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
যারা দেশ ছেড়ে যায়, আজকাল তাদের নিয়ে অনেক কথা হয়। এই দেশের কৃষক-শ্রমিকের কষ্টের টাকায় বিদেশে গিয়ে বড় হয়ে একজন আর দেশের দিকে ফিরে তাকাবে না– তা হয় না। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী তাদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির আগে তারা দেশে ফিরে এলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। মনে রাখতে হবে, আমরা মানুষকে শহর বিশেষ করে ঢাকা থেকে গ্রামেই ফিরিয়ে নিতে পারছি না। সেখানে বিদেশ থেকে উন্নত জীবনযাপন ছেড়ে তাদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানানো খাপছাড়া বটে। আমাদের প্রবাসী এই জনগোষ্ঠীকে দেশের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলার জন্যও গ্রামের উন্নয়ন দরকার। কারণ আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের নাড়ির সম্পর্ক গ্রামের সঙ্গে; শহরের সঙ্গে নয়।
কাজেই গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে– এই স্লোগান ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেই স্লোগান আবার জোরেশোরে শুরু করতে হবে। রাজনীতিকরা যেন আইন প্রণয়নের সময় গ্রামের কথা ভুলে না যান। আমলারা যেন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় মফস্বলের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। গ্রামে মাঝে মাঝে ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য রাস্তাঘাট করলেই চলবে না। গ্রামকে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই গ্রামের সঙ্গে মানুষের বন্ধন আরও নিবিড় হবে।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
- বিষয় :
- মাহবুবুর রাজ্জাক