ইসলাম ও সমাজ
দাম্পত্য সম্পর্ক: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
তোফায়েল আহমাদ মাক্কী
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি উন্নত জাতি বা সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমরা সাধারণত শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আধুনিক প্রযুক্তি, আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনের কথা বলে থাকি। কিন্তু এসবের পেছনে যে মৌলিক প্রতিষ্ঠানটি শিকড়ের ভূমিকা পালন করে তা হলো পরিবার। পরিবারের প্রাণকেন্দ্র হলো স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক।
একজন মানুষ দিনের শুরুতে যে মানসিক পরিবেশ নিয়ে ঘর থেকে বের হন, এর প্রভাব অনেক সময় তাঁর কর্মক্ষেত্র, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর পড়ে। ঘরে যদি থাকে ভালোবাসা, সম্মান, প্রশান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতা– তবে সেই প্রশান্তি তাঁর আচরণের মধ্য দিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিপরীতে ঘরে যদি প্রতিনিয়ত ঝগড়া, অপমান, অবিশ্বাস ও অশান্তি বিরাজ করে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাবও ব্যক্তির আচরণে প্রকাশ পেতে পারে।
ইসলাম এ বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাই দাম্পত্য জীবনকে নিছক সামাজিক প্রথা কিংবা জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং একে ভালোবাসা, মমতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সম্পর্কের ওপর গড়ে ওঠে একটি পরিবার, পরিবারগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সমাজ, আর সমাজের সম্মিলিত চরিত্রেই প্রতিফলিত হয় একটি জাতির নৈতিক ও মানবিক পরিচয়।
দুই.
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে তাঁর কুদরতের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর তাঁর নির্দেশনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আর-রূম: ২১)
এই আয়াতে দাম্পত্য জীবনের তিনটি মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে– প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা শুধু ভালোবাসার কথা বলেননি; ভালোবাসার পাশাপাশি দয়ার কথাও বলেছেন। কারণ জীবনের প্রতিটি দিন একই রকম থাকে না। কখনও অসুস্থতা আসে, কখনও আর্থিক সংকট দেখা দেয়, কখনও ভুল বোঝাবুঝি হয়, কখনও একজন অন্যজনের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। তখন শুধু আবেগ নয়; দয়া, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।
যে সংসারে ভালোবাসা আছে কিন্তু ক্ষমা নেই; প্রত্যাশা আছে কিন্তু সহনশীলতা নেই; অধিকার দাবি আছে কিন্তু দায়িত্ব পালনের মানসিকতা নেই– সে সংসারে প্রকৃত প্রশান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে কোরআনে অসাধারণ একটি উপমা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের পোশাকস্বরূপ।’ (সুরা আল-বাকারা: ১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষের দেহকে আবৃত করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অন্যের সম্মান রক্ষা করবে, দুর্বলতাকে আড়াল করবে এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়াবে। জীবনসঙ্গীর ব্যক্তিগত ভুলকে উপহাসের বিষয় বানানো, তাঁর দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করা কিংবা তাঁকে অপমান করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা এই সম্পর্কের মর্যাদার পরিপন্থি। দাম্পত্যের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তখনই, যখন দুজন মানুষ একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হয়ে ওঠেন।
তিন.
একটি সম্পর্কের গুরুত্ব কতটা গভীর, তা কখনও কখনও তাঁর বিপরীত দিকটি বিবেচনা করলেও উপলব্ধি করা যায়। সুস্থ দাম্পত্য জীবন যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য আমাদের জানতে হবে– এই সম্পর্ক নষ্ট করার ব্যাপারে শয়তান কতটা তৎপর! পবিত্র কোরআন ও হাদিসের কয়েকটি নির্দেশনা আমাদের সামনে এ বাস্তবতার একটি গভীর দিক তুলে ধরে।
আল্লাহ তায়ালা জাদুর অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত।’ (সুরা আল-বাকারা: ১০২)
অর্থাৎ জাদুর অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতো, তার একটি ছিল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করা। দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন যে মানুষের জীবনে কত গভীর সংকট তৈরি করতে পারে, উক্ত আয়াতের আলোচনায় সেটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস আরও গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়। তিনি বলেন, “ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। এরপর সে তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে তার সবচেয়ে নিকটবর্তী মর্যাদার অধিকারী হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের একজন এসে বলে, ‘আমি এই এই কাজ করেছি।’ তখন ইবলিস বলে, ‘তুমি কিছুই করোনি।’ এরপর আরেকজন এসে বলে, ‘আমি তাকে ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি।’ তখন ইবলিস তাকে নিজের নিকটবর্তী করে এবং বলে, ‘তুমিই তো কাজের কাজ করেছ!” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১৩)
হাদিসটি অত্যন্ত গভীর একটি বাস্তবতা আমাদের সামনে তুলে ধরে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোকে তার বিশেষ সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ, একটি দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু দুজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সন্তানদের মানসিক জগৎ, আত্মীয়তার বন্ধন এবং পারিবারিক স্থিতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা, মতপার্থক্য কিংবা ভুল বোঝাবুঝি দেখা দিলে শয়তানের এই প্ররোচনার কথা আমাদের মনে রাখা উচিত। আবেগের বশবর্তী হয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ধৈর্য ধারণ করা, পারস্পরিক আলোচনা করা এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করার আন্তরিক চেষ্টা করা প্রয়োজন।
চার.
দাম্পত্য জীবনের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হতে পারে সন্তানদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে। শিশুরা শুধু মা-বাবার উপদেশ শুনে শেখে না; তাদের দৈনন্দিন আচরণ দেখেও জীবন সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে।
যে শিশু দেখে তার মা-বাবাকে সম্মান করেন, মা-বাবার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেন, মতবিরোধ হলেও তারা শান্তভাবে কথা বলেন– সে শিশুর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, যে শিশু প্রতিনিয়ত চিৎকার, অপমান, হুমকি, অবহেলা কিংবা সহিংসতার পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার মনে ভয়, অনিরাপত্তা ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সব শিশুর প্রতিক্রিয়া এক নয়; তবু দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক সংঘাত তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একটি দোয়া শিখিয়েছেন– ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।’ (সুরা আল-ফুরকান: ৭৪)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দোয়ায় আল্লাহ তায়ালা পারিবারিক সুখ-শান্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ ও নেতৃত্বের অধিকারী হওয়ার প্রার্থনাকেও একত্র করেছেন। অর্থাৎ একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা কেবল নিজেদের সুখ-শান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই পরিবার থেকে যেন এমন মানুষ গড়ে ওঠে, যারা সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে এবং অন্যদের সামনে উত্তম আদর্শ স্থাপন করবে। তাই মা-বাবার দায়িত্ব শুধু সন্তানের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা নয়; তাদের সামনে একটি সম্মানজনক ও মানবিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত স্থাপন করাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব।
পাঁচ.
একটি পরিবার কখনও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। পরিবারে গড়ে ওঠা মানুষরাই কর্মক্ষেত্রে যান, ব্যবসা পরিচালনা করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ান, সামাজিক নেতৃত্ব দেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেন। কারণ একজন মানুষ শুধু স্বামী বা স্ত্রী নন; তিনি একই সঙ্গে বাবা কিংবা মা, সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধু, নাগরিক এবং বৃহত্তর সমাজের একজন সদস্য। সুতরাং তাঁর জীবনের একটি ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি তৈরি হলে, তা অন্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন একজন মানুষ বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত যদি ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও সংযম দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তার সুফল অনেক মানুষের জীবনে পৌঁছাতে পারে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রতিহিংসা কিংবা অসহিষ্ণুতা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করলে তার নেতিবাচক পরিণতিও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একজন সাধারণ মানুষের আচরণ যেমন একটি পরিবারকে প্রভাবিত করে, তেমনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সিদ্ধান্ত সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশ্য বিশ্বসমাজের শান্তি বা অশান্তির জন্য শুধু পারিবারিক সম্পর্ককে দায়ী করা যায় না। এখানে বিষয়টি কোনো সরল সূত্র নয়– সুস্থ পরিবার থাকলেই সমাজের সব সমস্যা দূর হবে, কিংবা কোনো পরিবারে সমস্যা থাকলেই তার সন্তান খারাপ মানুষ হবে, এমন দাবি করা যায় না। তবে পরিবার হলো মূল্যবোধ শেখার অন্যতম প্রধান স্থান।
একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়াতে হবে। পরিবার এসব গুণের অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
আসুন আমরা এমন দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন গড়ে তুলি, যেখানে ভালোবাসা হবে সম্পর্কের বন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা হবে আচরণের সৌন্দর্য আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হবে জীবনের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের ঘরগুলো হোক প্রশান্তি ও রহমতের আশ্রয়, আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠুক ইমান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয়, আমাদের পরিবারগুলো হয়ে উঠুক সমাজের কল্যাণ ও উত্তম নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরিবারগুলোকে সুখী ও শান্তিময় করুন, আমাদের সমাজকে ন্যায়, সম্প্রীতি ও কল্যাণে সমৃদ্ধ করুন এবং আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুখী পরিবার, কল্যাণকর সমাজ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তোফায়েল আহমাদ মাক্কী: লেকচারার (খণ্ডকালীন), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার