জাতিসংঘ
সাধারণ পরিষদে ক্ষমতার খেলা আর বিচারহীনতার রাজত্ব
নাসরিন মালিক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকগুলো সাধারণত খুব একটা রোমাঞ্চকর হয় না। কিন্তু এ বছরের বৈঠকটি যেন এক অস্থির ও সংকটাপন্ন বিশ্বকে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরল। এটি এমন এক বিশ্ব, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থার কাঠামো ভেঙে পড়ছে আর মানবিক সহায়তার যন্ত্রটি অতিরিক্ত চাপে হাঁসফাঁস করছে। সেখানে যা ঘটল, তাকে প্রস্তাব পাস কিংবা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ বলা চলে না; বরং তা ছিল শুধু ক্ষমতার লড়াই, পারস্পরিক ক্ষোভ আর ব্যাপক বিশৃঙ্খলার এক প্রদর্শনী।
ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়ার মতো এটি ছিল এমন চারটি ভয়াবহ ও অস্থিতিশীল সংঘাতের একটি বাস্তব ছবি, যা সমাধানের কোনো উপায় বা সদিচ্ছা কারও মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। ইউক্রেন, ইরান, ফিলিস্তিন ও সুদান। ভলোদিমির জেলেনস্কি টানা পাঁচ বছরের রুশ আগ্রাসনের এক মর্মান্তিক হিসাব তুলে ধরলেন। উভয় পক্ষে শত শত মানুষের জীবনহানি রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার দুর্বলতা এবং এই পুরো পরিস্থিতির ‘পাগলামি’। ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও চুক্তি না করলে ইরানকে ‘ধূলিসাৎ’ করার হুমকি দিলেন। এটি এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা এতবার দেওয়া হয়েছে যে তা বারবার আওড়ানো এখন কেবল এর অসারতাকে স্পষ্ট করে তোলে। জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইরান নিজেই মার্কিন সন্ত্রাসবাদ ও আগ্রাসনের শিকার এবং দেশ রক্ষায় তারা ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ প্রয়োগ করবেন। তাঁর ভাষণ চলাকালে মার্কিন প্রতিনিধি দলের একমাত্র প্রতিনিধি ঘর থেকে বের হয়ে যান।
এই লাগামহীন ও কুৎসিত মারমুখী আচরণের মাঝে সত্যকে মেনে নেওয়ার আকুল আর্জিগুলো ক্ষমতার লোভে পিষ্ট হয়ে গেল। জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বললেন, ইসরায়েল সরকারের বিচারহীনতার বোধ ‘ভীতিজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে’। তিনি আরও যোগ করেন, “তারা এখন আর ‘আমরা কি শাস্তি না পেয়ে পার পেয়ে যাব?’– এই প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করে না। কারণ, এর উত্তর তারা আগেই জেনে গেছে।”
তিনি বলেন, ‘যদি দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইনকে অবহেলা করা যায়, তবে সেই আইনের ভিত্তিটা আসলে কোথায়?’ এই প্রশ্নের যেন এক বাস্তব উত্তর দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পরোয়ানাভুক্ত একমাত্র নেতা হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে এলেন এবং বরাবরের মতো চরম যুদ্ধংদেহী বক্তব্য দিলেন। এর অর্থ স্পষ্ট–আইনের মূল্য এখন আর কিছুই নেই।
আমরা আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, তা কেবল আন্তরিক কূটনীতিক বা দায়িত্বজ্ঞানহীন যুদ্ধরত পক্ষগুলোর বিষয় নয়। এর চেয়েও জটিল এক সমস্যা আমাদের সামনে উপস্থিত–যুদ্ধের নিজস্ব রূপটাই খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ড্রোন প্রযুক্তির বিস্তার, এটি সহজে হাতের কাছে পাওয়া এবং এর আধুনিকতার কারণে যুদ্ধকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে রাখা ক্রমে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এসব যুদ্ধ এখন দূরনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা কখনও ভয়াবহ আক্রমণাত্মক, আবার কখনও ধীরগতির লড়াইয়ের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ফলে যুদ্ধের শুরু বা শেষ চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন সাধারণ জীবনযাত্রা স্থবির করে দিতে সস্তা ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে; যেমনটা মার্কিন আক্রমণের জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া পুরো গলফ অঞ্চলকে জিম্মি করে রেখেছে। সুদানের যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট সম্মুখ রণক্ষেত্র নেই, আর গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ বলতে আসলে কম মাত্রার আক্রমণকেই বোঝানো হচ্ছে।
২০২৬ সালের এই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকটি ছিল বহু বিষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যেমন–আন্তর্জাতিক আইনের অবক্ষয়, ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পতনের দ্রুততা, আর বলির পাঁঠা হওয়া ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আকুল চেষ্টা। তবে আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে যুদ্ধরত শক্তিগুলো নিজেরাও এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধনীতি ও এক অনিশ্চিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখছে। ‘সামনে কী আসছে’–তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। যেমন–মধ্যম ক্ষমতার দেশগুলোর জোটবদ্ধ এক ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ও ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ভাঙন, নাকি এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য? মানুষ হিসেবে আমরা সাধারণত স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতির কথা ভাবি। বাস্তবতা হয়তো তেমনটা হবে না; বরং নিউইয়র্কে গত সপ্তাহে যা দেখা গেল, সেটিই হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বেপরোয়া ও উদ্ধত নেতাদের অধীনে এক দীর্ঘস্থায়ী টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, যেখানে শাস্তি না পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে তারা মাতোয়ারা, যাদের কোনো এক্সিট প্ল্যান নেই, আর বাকি পুরো বিশ্বব্যবস্থা তাদের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরিণতি কিছুটা লাঘব করতে তাদের সঙ্গে কোনোমতে আপস করে চলতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের এই নতুন শৃঙ্খলা আসলে আর কিছুই নয়; এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ বা নিরুপায় হয়ে মেনে নেওয়া।
নাসরিন মালিক: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক;
দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর
ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- জাতিসংঘ