ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সমাজ

কেবল অভিযান নয়, বন্ধ হোক কিশোর গ্যাংয়ের উৎস

কেবল অভিযান নয়, বন্ধ হোক কিশোর গ্যাংয়ের উৎস
×
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি কুমিল্লার ১৮টি থানায় দুই দফায় একযোগে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। প্রথম দফায় ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলা অভিযানে নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছয় শতাধিক কিশোরকে আটক করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৬ সেপ্টেম্বর আবারও অভিযান চালিয়ে আরও ২৫৪ কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে বলে জানা যায়।

দেশে নানা সময়ে নানা ধরনের পুলিশি অভিযানের কথা শোনা গেলেও কিশোর গ্যাং-এর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযানের কথা আগে শোনা যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে বটে। কিন্তু ১৮টি থানায় একযোগে অভিযানকে কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী ও অভূতপূর্ব বলা চলে। কিন্তু প্রথম দফার অভিযান শেষ হতে না হতেই জানা গেছে, কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল থানায় অভিযানে আটককৃত কিশোর এবং তাদের অভিভাবকরা হামলা চালিয়ে থানার আসবাব ও দরজা ভাঙচুর করেছে। এক পর্যায়ে ২২ জন আটক কিশোর থানা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে তারা থানার সামনে দাঁড়িয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানও দেয়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, যে রাষ্ট্র নিজের থানাকে সুরক্ষা দিতে পারে না, সে কীভাবে একটি প্রজন্মকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করবে?

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমাদের কৈশোর কিংবা যৌবনে, এমনকি প্রাক-বৃদ্ধত্বেও ‘কিশোর গ্যাং’ বলে কোনো শব্দ বা শব্দবন্ধের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। যতটুকু মনে পড়ে, ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দবন্ধটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে। ওই বছর ৬ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে কিশোর গ্যাং-এর দ্বন্দ্বে আদনান কবির নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্র খুন হন। সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে সমস্যাটি রাজধানী ছাড়িয়ে জেলা-উপজেলা শহরেও বিস্তৃতি লাভ করে। গত দুই বছরে সমস্যাটি রীতিমতো আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। খবরের কাগজের পাতায়  প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কিশোর গ্যাং-এর মারামারি, খুন–এসবের খবর পাওয়া যায়। অবস্থাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে রাস্তায় চার-পাঁচজন কিশোরকে একত্রে দেখলে সবাই এখন ভয় পান; যথাসম্ভব তাদের এড়িয়ে দূর দিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করেন।

 কথা হলো, হঠাৎ করে দেশজুড়ে কিশোর গ্যাং-এর এই বাম্পার ফলনের কারণ কী? এ নিয়ে দেশে কোনো একাডেমিক গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে এ কথা বলা যায়, এ সমস্যা একক কোনো কারণের ফল নয়; বরং বহুবিধ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণের সম্মিলিত ফসল হলো এই কিশোর গ্যাং–ঠিক যেমনটি ঘটেছিল প্রায় দুইশ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইতিহাস বলে, শিল্পায়ন ও শহরায়নের হাত ধরে উনিশ শতকের শুরুতে নিউইয়র্কে ‘ফাইভ পয়েন্টস’ নামে বিশ্বে প্রথম কিশোর গ্যাং বা যুব অপরাধ চক্রের আত্মপ্রকাশ করে, যা ছিল বিশ্বের প্রথম নথিভুক্ত কিশোর গ্যাং। ইউরোপ থেকে আসা দরিদ্র ও কর্মহীন অভিবাসী কিশোররা আত্মরক্ষা এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্য প্রথম এসব দল গঠন করে। পরে উনিশ শতকের শেষের দিকে  লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহামের মতো শিল্পশহরগুলোতেও ‘স্কাটলার্স’ বা এ জাতীয় বিভিন্ন কিশোর গ্যাং-এর উত্থান ঘটে। বিশ শতকের শেষের দিকে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন বড় শহরেও কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে এগুলোর সঙ্গে বড় বা প্রাপ্তবয়স্ক আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের যোগাযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশে নব্বই দশক থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বখাটে তরুণদের মাঝে এই সংস্কৃতি দানা বাঁধতে শুরু করলেও গত এক দশকে এটি বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সব ব্যাধিরই যেমন কারণ থাকে, কিশোর গ্যাং বিস্তারেরও কারণ আছে। অনেকেই মনে করেন শহরায়নের চাপে একদিকে যেমন যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত থাকায় সন্তানের মানসিক জগৎ থেকে যাচ্ছে অরক্ষিত। খেলার মাঠ পরিণত হয়েছে কংক্রিটের ভবনে, সুস্থ বিনোদনের বিকল্প হিসেবে হাতে এসে গেছে স্মার্টফোন আর অ্যালগরিদম-চালিত সহিংস কনটেন্ট। এর ফলে অনেকেই রাস্তায় খুঁজে নিচ্ছে তাদের সাথি, গড়ে উঠছে নতুন সঙ্গ; যা একসময় রূপান্তরিত হচ্ছে ‘গ্যাং’-এ।

সামাজিক আর সাংস্কৃতিক অবক্ষয় তো আছেই। সেই সঙ্গে আমাদের অবক্ষয়িত রাজনীতিও এ ক্ষেত্রে কম ভূমিকা রাখছে না। অনেকেই মনে করেন রাজনীতিতে কিশোরদের ব্যবহারও কিশোর গ্যাং তৈরির অন্যতম একটি কারণ। অনেক রাজনৈতিক দলের কাছে কিশোররা হলো ভোট আর মিছিলের মূল্যবান কাঁচামাল। মিছিলে ভিড় বাড়াতে, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে, দখল-বেদখলের খেলায় পেশিশক্তি জোগান দিতে কিশোরদের ব্যবহার করা হয় নির্বিচারে। পুলিশ যখন এই কিশোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যায়, তখন শুরু হয় রাজনৈতিক তদবির আর চাপ। এই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিশোর গ্যাংকে অপরাজেয় করে তুলেছে। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সমস্যাটি রীতিমতো আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। 

শুধু তাই নয়, প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকে একজন ‘বড় ভাই’–স্থানীয় নেতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা এলাকার দাপুটে যুবক, যিনি বিপদে কিশোরদের ছাড়িয়ে আনেন, বিনিময়ে তাদের দিয়ে করান অবৈধ কাজ। এই সামন্ততান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা কিশোরদের মনে গেঁথে দেয় এক বিপজ্জনক বিশ্বাস–আইন ভাঙলেও শাস্তি নেই, কারণ মাথার ওপর আছেন ‘বড় ভাই’। এই মানসিকতা তাদের অপরাধে আরও বেপরোয়া করে তোলে, আর সমাজে জন্ম দেয় দায়মুক্তির এক ভয়াবহ সংস্কৃতির। এসবের সঙ্গে যোগ হচ্ছে পুঁজিবাদী ভোগবাদের ছোবল। বাজার অর্থনীতি তো প্রতিনিয়ত বার্তা দিয়েই যাচ্ছে–মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার ভোগ-সামর্থ্যে। ব্র্যান্ডের পোশাক, দামি মোবাইল, বাইক ইত্যাদি এখন কিশোরদের কাছে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি। কিন্তু বৈধ পথে এসব অর্জনের সুযোগ সীমিত, বিশেষত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরদের জন্য। বিজ্ঞাপন আর সামাজিক মাধ্যমের তৈরি করা মোহ আর বাস্তব সুযোগের বিশাল ফারাক তাদের ঠেলে দিচ্ছে অবৈধ পথে দ্রুত অর্থ উপার্জনের দিকে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে কিশোর গ্যাং-এর মতো গ্যাং সৃষ্টি।

কুমিল্লায় পুলিশ যে অভিযান চালিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে নিশ্চয়ই। শুধু অভিযান চালিয়ে আর কিছু সংখ্যক কিশোরকে আটক করে এই গ্যাং সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। এর মূলোৎপাটন করতে হলে এর অন্তর্নিহিত কারণগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। বন্ধ করতে হবে গ্যাং তৈরির সব কারখানা। অন্যথায় প্রতিটি অভিযানের পরিণতি হবে একই–কিশোররা আটক হবে, আবার ছাড়াও পেয়ে যাবে, আর সমাজ প্রতীক্ষা করবে পরবর্তী রক্তাক্ত শিরোনামের।

মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×