ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

চিন্তাচর্চা

মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির পরিসর রক্ষা হোক সরকারের অঙ্গীকার

মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির পরিসর রক্ষা হোক সরকারের অঙ্গীকার
×
×

মনজুর রশীদ

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় কেবল তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামরিক শক্তি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা এবং বিকাশের মধ্যেই প্রতিফলিত হয় জাতির মনন, মানবিকতা, রুচিবোধ ও সভ্যতার গভীরতম পরিচয়। জাতি কতটা উন্নত, উদার, মানবিক এবং সৃজনশীল– তা অনুধাবন করতে হলে তার শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কারণ বস্তুগত উন্নয়ন একটি জাতির জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা তার চিন্তা-চেতনা ও আত্মপরিচয়কে সমৃদ্ধ করে।

যে সমাজে শিল্পীর কণ্ঠ স্বাধীন; লেখকের কলম মুক্ত; তরুণের চিন্তা প্রশ্নমুখর এবং সাংস্কৃতিক পরিসর প্রাণবন্ত, সেই সমাজে অন্ধবিশ্বাস ও গোঁড়ামির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা অনেকটাই কঠিন। কারণ সংস্কৃতি মানুষকে শুধু বিনোদন দেয় না; মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করতে শেখায় এবং নিজের বিশ্বাসকেও যুক্তির আলোয় যাচাই করার শক্তি ও সাহস জোগায়।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘ কাঠ-খড় পুড়িয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে প্রত্যাশা যেমন রয়েছে বিস্তর, তেমনি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন।

সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি কেবল জাতীয় দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন; রাজনৈতিকভাবে গুণগান করা কবি-সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান কিংবা ঐতিহ্য সংরক্ষণের শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা? নাকি সংস্কৃতিকে একটি উদার, মানবিক, যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ, কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য ও বিদ্রোহের চেতনা, লালনের মানবধর্ম, জসীম উদ্‌দীনের লোকজ জীবনবোধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য ও সংগীত– এসবই আমাদের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করার উপাদান। এই ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখতে হলে পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাট্যচর্চা, চলচ্চিত্র, চিত্রাঙ্কন, সংগীতশিক্ষা ও মুক্তবুদ্ধির পরিসরকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব আরোপ সবচেয়ে জরুরি। 

নানা কারণে আমাদের দেশে সংস্কৃতির এই পরিসর সংকুচিত হওয়ার ফলে তার শূন্যস্থান ক্রমেই দখল করছে অসহিষ্ণুতা, গুজব, কুসংস্কার ও পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও অবকাঠামো স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পাবে। সংস্কৃতির নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে শুধুই একটি গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়; জাতীয় পরিকল্পনায় যদি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সব সময় উপেক্ষিত হতে থাকে, তাহলে তার ক্ষতি তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না। ধরা পড়বে দীর্ঘ মেয়াদে– মানুষের চিন্তার সংকীর্ণতায়; তরুণদের সৃজনশীলতার অভাবে; সামাজিক অসহিষ্ণুতায় এবং ভিন্নমতের প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থায়।

বিএনপি যেহেতু ক্ষমতায়, তাই প্রশ্ন, সরকার কি সংস্কৃতির জন্য পর্যাপ্ত ও স্বচ্ছ কোনো বাজেট বরাদ্দ করছে? জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণপাঠাগারগুলো কি কার্যকর? শিল্পীরা কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে একই রকম সহায়তা পাচ্ছেন? চলচ্চিত্র, নাটক, প্রকাশনা ও সংগীতশিল্পের জন্য কি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে? দেশে দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলো চালুর কোনো উদ্যোগ কি এখন  পর্যন্ত সরকারের ভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সাংস্কৃতিক চর্চা কি নিয়মিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে? কী কারণে দেশে আবহমানকাল ধরে চলা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান একের পর এক পণ্ড হয়ে যাচ্ছে? এমন মব কালচার দমনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ কি জনমনে এখন পর্যন্ত স্বস্তি এনে দিতে পারছে?

সংস্কৃতি তখনই প্রাণবন্ত হয়, যখন তা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে; প্রচলিত চিন্তার বাইরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কী কারণে আজকের দিনেও শিল্পীকে আগে থেকেই ভাবতে হবে কোন বক্তব্যে ক্ষমতাসীনরা সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হবেন কিংবা নাট্যকর্মী যদি ভিন্নমত প্রকাশের কারণে নাটক মঞ্চায়ন করতে ভয় পান, তাহলে সৃজনশীলতার স্বাভাবিক বিকাশ কীভাবে হবে? 
বিএনপি সরকার যদি সত্যিই একটি উদার, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় তাহলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংস্কৃতিকে হতে হবে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অংশ, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পাশাপাশি দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে থাকা সমকালীন কবি, লেখক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকর্মী, লোকশিল্পী এবং নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল মানুষ সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা পাবে।

মনজুর রশীদ: সমাজ বিশ্লেষক, 
লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×