রাজনীতি
ইশরাকের পদত্যাগ যেসব বার্তা দিচ্ছে
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই হয়েছে। তবে তিনি যেভাবে পদত্যাগ করেছেন, সেটা রাজনীতিসচেতন মানুষের মনোযোগ কাড়বে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে কর্মী-সমর্থক নিয়ে এসে নিজের মতো এর প্রেক্ষাপট বর্ণনার ঘটনা রেকর্ড হয়ে থাকবে। আগেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ঘটনা রেকর্ড হয়ে আছে, যেগুলো সর্বশেষ ঘটনায় পরিবেশিত খবরের সঙ্গে উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যম।
কীভাবে কী ঘটেছে, তা এখানে ফের উল্লেখের প্রয়োজন নেই। বহুল আলোচিত ঘটনা ধরে লেখার এই এক সুবিধা। তবে এটা বলতে হবে, ইশরাক হোসেন কোনো অপরাধ ঘটাতে গিয়ে বিতর্কিত হননি। বিধি ও রীতিবহির্ভূতভাবে পদক্ষেপ নেওয়াতেই আসলে বিতর্কিত হয়েছেন। এর আগে রাজধানীর আরেকটি ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের একজন এমপির নাম আসে। সেই ঘটনা ছিল অপরাধমূলক। গভীর রাতে লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে একটি সুপরিচিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। নজিরবিহীন ওই ঘটনায় জড়িত বলে আলোচিত হওয়ায় সেই এমপিকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
কেউ তাঁর অবাধ্য হননি; পদত্যাগ করতে বিলম্বও করেননি। আর দুটি ঘটনাতেই প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হয়েছেন। তাতে দল কিংবা সরকারের কারও বিতর্কিত কাজে যে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন নেই– সেটা প্রকাশ পেয়েছে। গেল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হয়ে আসা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তির জন্য এটা ইতিবাচক বৈ কি। তবে ইশরাক হোসেনের বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে ভিন্নমত রয়েছে বলে শোনা যায়। তাঁকে শোকজ করে দুঃখ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া যেত বলে মত রয়েছে। এটাও ঠিক, মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হলেও রাজধানীর একটি আসনে এমপি হিসেবে তাঁর দৃঢ় অবস্থান থাকছে। সেখানে মাদকসহ জনজীবনের সমস্যা মোকাবিলায় তিনি কাজ করে যাবেন বলে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বভাবতই এতে অসম্মত হননি। আর আশা করা যায়, সর্বশেষ অভিজ্ঞতার নিরিখে বিধিবহির্ভূতভাবে ভূমিকা রাখার বিষয়ে তিনি সতর্ক হবেন।
ইশরাক হোসেনের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা রাজধানীতে বিএনপির মজবুত নেতা ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে জনপ্রিয় ছিলেন, বিশেষত পুরান ঢাকায়। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবেও লোকে তাঁকে মনে রাখবে। ইশরাক হোসেনের জন্য এটাও চ্যালেঞ্জের– মানুষ তাঁকে সাদেক হোসেন খোকার পুত্র হিসেবে দেখে। বিখ্যাত পিতার সন্তান একই পথের পথিক হলে সেটা চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয় বৈ কি। ইশরাক হোসেনকে সেটি মনে রেখেও সামনে পথ চলতে হবে। যে ঘটনায় তিনি মন্ত্রিত্ব হারালেন, সেটা মনে রেখে আইনপ্রণেতা হিসেবেই এখন ভূমিকা রাখতে হবে। নির্বাচনী এলাকার সমস্যাও দেখতে হবে বিধিবদ্ধ উপায়ে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভা ও দলের সবাইকে সম্ভবত এই বার্তাই দিতে চাইছেন। সে জন্য কোনো ঘটনায় গুরুতর বিতর্ক সৃষ্টি হলে বিলম্ব না করে ‘প্রত্যাশিত পদক্ষেপ’ নিতে দ্বিধা করছেন না।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে জানুয়ারির শেষদিকে। এই ধারায় এক পর্যায়ে সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনও হবে। ঢাকায় এখন দুটি সিটি করপোরেশন। আমরা জানি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে শপথ গ্রহণের দাবিতে ইশরাক সমর্থকরা দিনের পর দিন কী করেছিলেন। এতে সেই সরকার রীতিমতো চাপে পড়ে গিয়েছিল। এখন নতুন পরিস্থিতিতে তিনি মেয়র পদে লড়বেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে। মাদকবিরোধী বিতর্কিত কাণ্ডে সেই সম্ভাবনা অনুজ্জ্বল, না উজ্জ্বল হলো, সেটা দেখতে অবশ্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে তিনি মেয়র নির্বাচিত হলেও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলার কাজ পুলিশকেই করতে দিতে হবে। আর মাদকসেবী কিংবা এর খুচরা বিক্রেতাদের ধরপাকড় তো এর মূলে হাত দেওয়ার তুলনায় হালকা কাজ। সারাদেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার বলা যায় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ জন্য প্রয়োজন একটা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’।
মেয়র পদে তাঁর বদলে দল অন্য কাউকে পছন্দ করলে ইশরাক হোসেন তাঁর হয়ে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন। ‘দল’ বলতে প্রধানমন্ত্রীকেই বুঝিয়েছেন তিনি। দলে ও সরকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থান অপ্রতিদ্বন্দ্বী বৈ কি। তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যথা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী কাউকে ‘মনোনয়ন’ দিলেই তিনি সহজে মেয়র হয়ে যাবেন, পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। অতীতে মেয়র নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের জয়যুক্ত হতে দেখা গেছে। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলে সরকার বদল হয় না বলে জনসাধারণও সেটাকে ভিন্নভাবে নিয়ে থাকে। অনেক সময় সরকারের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাঁকে উপযুক্ত বার্তা দিতেও স্থানীয় নির্বাচনে সরকারবিরোধী প্রার্থীদের জয়ী করে তারা। ‘এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে’ সরকারি দল সমর্থিতদের জিতিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকে বিএনপি সরকার এবার যে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তাতে সরকারের জনসমর্থন দ্রুত নামতে শুরু করলেও অবাক হওয়া যাবে না। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিতর্কিত হওয়ার ঘটনায় সরকারের বিব্রত হওয়ার কারণ রয়েছে। রাজধানীর দুটি ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেটা অনেকখানি প্রতিফলিত। তাঁর সরকার ও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এটা যত দ্রুত বুঝবেন, ততই ভালো।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনায় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াত ও এনসিপি যে বক্তব্য দিয়েছে, তাতে তারা সেটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলেই প্রচার করতে আগ্রহী। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম তো মাদক সমস্যাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। জাতি নাকি আসলে তাঁর পদত্যাগ দেখতে চায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘নিজের কাজ’ না করে সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত বলে তাঁর মন্তব্যও নজর কাড়ে।
এটা অবশ্য ঠিক, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে চলেছে। কেবল তথ্য-উপাত্ত জুগিয়ে সেটা আড়াল করা যাবে না। জনমনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ঘন হচ্ছে। এটাই পরিস্থিতি বোঝার প্রধান সূচক। ইশরাক হোসেন কিংবা তাঁর সমর্থকদের এই বক্তব্যও ভুল নয় যে, মাদকের মতো সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশ উদ্যোগী নয়। পুলিশকে সত্যি বলতে কোনো ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের যেটুকু সক্রিয়তা দেখা যেত, সেটুকুও পরিলক্ষিত নয়। পুলিশ কবে আর কীভাবে সক্রিয় হবে, সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে শান্তিপ্রিয় মানুষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বটেই; প্রধানমন্ত্রীকেও এটা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের সঙ্গে দেশবাসীও কঠিন থেকে কঠিনতর কিছু সমস্যা মোকাবিলা করছে। আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে অর্থনীতি-সংক্রান্ত সংকট যে কত অসহনীয়, সেটা কাউকে বলে বোঝানোর দরকার নেই। কর্মহীনতা ও মূল্যস্ফীতির যুগল সংকটের মধ্যে বিনিয়োগের যেটুকু সম্ভাবনা রয়েছে, সেটাও বাধাগ্রস্ত করছে দেশজুড়ে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের কেউ ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করলে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবতই সেটাকে হালকাভাবে নেবেন না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত সাধারণ প্রত্যাশার কথাও তাঁর মাথায় রয়েছে বলে ধারণা করি।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- ইশরাক হোসেন
- পদত্যাগ