সমকালীন প্রসঙ্গ
আইজিপি নয়, সরকারের মনোভাবই মুখ্য
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে পুলিশ কী মূর্তিতে আবির্ভূত হতো, সেটি অনুমেয়। তবে গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ায় পুলিশ কী পরিস্থিতিতে পড়েছিল, সেটিও সবাই প্রত্যক্ষ করেছি। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে পুলিশও কার্যত পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের কাজে ফেরাতে বেগ পেতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে। পুলিশকে রীতিমতো পাহারা দিয়ে রাখতে হয় আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নেওয়া সেনাবাহিনীকে। বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেনি কখনও। পুলিশকেও কখনও এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। কাছাকাছি সময়ে আরও যেসব দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়, তার কোথাও কি পুলিশকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে?
পুলিশ ঘিরে যে কোনো আলোচনায় এই প্রেক্ষাপট মাথায় রাখা দরকার। তবে দুই বছরের বেশি সময় পরও পুলিশকে সক্রিয় করা গেল না কেন? পুলিশে ‘সংস্কার’ আনার বিষয়ে তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আলোচনা হলো। পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ প্রতিষ্ঠার কথাও শোনা গিয়েছিল। সেটি ধরে অগ্রগতি আনা গেল না কেন, সে আলোচনা আর হচ্ছে না। অথচ প্রচলিত ধারায় থেকে পুলিশকে সক্রিয় করা যায়নি।
পুলিশের ‘এলিট ফোর্স’ বলে বিবেচিত র্যাবকে করা হয়েছে এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন)। ক্রসফায়ার ও গুম-খুনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ায় র্যাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিতর্কিত হয়েছিল। তাতে এটিকে বিলুপ্ত করার প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্যও গড়ে ওঠে। সেটি না করে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে যেভাবে এসআরবি গঠন করা হলো; তার সমালোচনাই বেশি হয়েছে। তবে র্যাব কিংবা পুলিশ কোন্ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, সেটি আসলে নির্ভর করে সরকারের ওপর। তার রাজনৈতিক ইচ্ছাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্ববহ।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে পুলিশ ও র্যাব দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়। বিরোধী দল দমন করা হয়ে ওঠে তাদের মুখ্য কাজ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত নজিরবিহীন নৃশংসতা এরই পরিণাম। এর প্রতিক্রিয়ায় পুলিশের ওপরেও নৃশংসতা ঘটেছে। এতে বিদেশেও আমাদের ভাবমূর্তি মলিন হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাষ্ট্রের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ক্ষয়ের শিকার কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এমনকি, ওইসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে জনআস্থা উঠে যায়। সবচেয়ে বেশি আস্থা হারায় পুলিশ ও র্যাব, যার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। সম্পদশালী থেকে নিঃস্ব নাগরিকও নানা কারণে পুলিশের শরণাপন্ন হয়। বিদেশি নাগরিকদেরও নিতে হয় পুলিশি সেবা। পথে বেরোলেই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সেই বাহিনীর ওপর জনআস্থা বিনষ্ট হওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক।
এটাও বড় সংকটের জায়গা যে, আজ পর্যন্ত পুলিশের ওপর আস্থা ফেরানোর কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এখনও বলা হচ্ছে, পুলিশ মনোবলহীন। মাঝে তাদের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল। সেটাও এখন স্থগিত। পুলিশে ধাপে ধাপে অনেক রদবদলও হয়েছে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান শাসনামলে। অপরাধী বলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত হয়েছে পদক্ষেপ। তারপরও বলা হচ্ছে, পুলিশে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সহযোগীরা রয়ে গেছে এবং তারা এখনও তৎপর। নানা ঘটনায় বলা হচ্ছে, এদের কারণেই পুলিশকে সক্রিয় করা যাচ্ছে না।
পুলিশকে সক্রিয় করার দায়িত্বটা সরকারের। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত ছিল না। গণঅভ্যুত্থানের পর তারা যেভাবে পরিস্থিতি সামলেছে, সেটা নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। মাঠে থাকা সেনাবাহিনীকেও তারা ঠিকমতো কাজ করতে দেয়নি বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিশেষত ‘মব’ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বলে অনেকে মনে করেন। নির্বাচিত সরকার এলে এসব বন্ধের প্রত্যাশা ছিল; সেটাও পূরণ হচ্ছে না দেখে মানুষ এখন আরও হতাশ।
অপরাধ বেড়ে চলেছে বললে অবশ্য অনেকে সরকারি তথ্য-উপাত্ত নিয়ে হাজির হন। ওইসব তথ্য বাস্তবতার কতখানি প্রতিফলন ঘটায়, সেই প্রশ্ন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না। বিশেষত ক্ষমতাহীন, নানা ধরনের সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মত-পথের মানুষ। তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়লে তবেই বলা যাবে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে। আরেকটি বড় সূচক হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। বিদেশিদের কথা পরে; দেশি বিনিয়োগকারীরাও কি আস্থাশীল হয়ে উঠেছেন; এমনকি ‘গণতন্ত্রে উত্তরণ’ ঘটার পর?

নিরাপত্তাবোধ বাড়লে হালে আইজিপি যেসব বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হলেন, সেই ঘটনাও ঘটত না। ‘ক্রসফায়ার’ এত নিন্দিত হওয়ার পরও সরকার অনুমোদন করলে পুলিশ সেটা করবে বলে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন, তাতে বাহিনীটির হতাশাই আসলে প্রকাশ পেয়েছে। জনগণ অবশ্য বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শুধু হতাশ নয়; ক্ষুব্ধ। তাদেরও একাংশ পথেঘাটে বলে, চিহ্নিত অপরাধীদের ক্রসফায়ারে না ফেললে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তবে বাস্তবতা হলো, পুলিশ কিংবা এসআরবি কারও পক্ষেই আগের ধারায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ আর নেই।
খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় শাসনামলে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর নামে যা হয়েছিল, তেমন ‘অপারেশন’ও চালানো হবে না বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। দেশে যত মাদকের বিস্তারই ঘটুক, সেটা মোকাবিলায় শেখ হাসিনার আমলে ব্যাপকতা পাওয়া ক্রসফায়ার সংস্কৃতির পুনঃপ্রবর্তনও সম্ভব নয়। আইজিপি এটা বোঝেন না– তা বলা যাবে না। তবে পুলিশ যে অবস্থায় রয়েছে, তার প্রধান হিসেবে তিনি স্বস্তিবোধ করছেন না; এটা পরিষ্কার। পুলিশ সদরদপ্তর থেকে এক প্রকার দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েও আইজিপির ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে ‘সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান’ প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন।
জাপান সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী এ প্রশ্নে নতুন কোনো অবস্থান নেবেন কিনা, কে জানে! তবে নিশ্চিত করেই বলা যায়, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সম্প্রতি তাঁর খুলনা সফরের দিনেই ওই শহরে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর একজন নারী; সম্ভবত মাদক সম্পর্কিত অপরাধের শিকার। এক সময় এসিড সন্ত্রাস অনেক বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন সরকারকে কঠোর হতে হয়। তাতে সুফল মিলেছিল। প্রধানমন্ত্রীকে এখন মাদকসহ অপরাধ দমনে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ক্ষমতাসীন দলের দুর্বৃত্তরা এ ধরনের লক্ষ্য অর্জনে সব সময়ই প্রধান বাধা। সেটি অতিক্রমের কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হবে। পুলিশ এ ক্ষেত্রে বাধা হবে বলে মনে হয় না। ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠন কাজে অগ্রগতি চাইলেই আনা যাবে। অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা চলছে, সেটিও কিছুটা কাটবে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- আইজিপি
- সরকার
- ক্রসফায়ার