ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

উদীচী: সংস্কৃতির সংগ্রামে মানুষের মুক্তি

উদীচী: সংস্কৃতির সংগ্রামে মানুষের মুক্তি
×
×

অমিত রঞ্জন দে

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু করা উদীচীর ৫৮ বছর শুধু সাংস্কৃতিক চর্চার ইতিহাস নয়; এটি শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ অঙ্গীকার। উদীচীর সাংগঠনিক দর্শনের দিকে তাকালে এর মূল আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে– শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই আকাঙ্ক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ভাবনা নয়; বরং বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিকশিত সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনারই একটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

ভাষার অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায় এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন– সবকিছু মিলেই বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ক্রমে একটি বিস্তৃত রূপ লাভ করে। উদীচীর চিন্তা ও কর্মধারায় সেই বিস্তৃত মুক্তির ধারণারই প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও মানুষের মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় না। বরং তখন স্বাধীনতার অর্থ আরও বিস্তৃত হয়– অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়, গণতান্ত্রিক অধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা এবং সৃষ্টিশীলতার স্বাধীনতা তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। এই বিস্তৃত মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই উদীচীর সাংস্কৃতিক চর্চাকে মানুষের জীবন ও সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আকাঙ্ক্ষারও বহিঃপ্রকাশ। সেই সংগ্রামে সংস্কৃতি ছিল মানুষের আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের অন্যতম শক্তি। গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে গভীরতর করেছে। উদীচী সেই সাংস্কৃতিক ধারাকেই তার নিজস্ব কর্মযাত্রায় ধারণ করেছে। এখানেই উদীচীর সাংস্কৃতিক দর্শনের বিশেষত্ব। সংস্কৃতি জীবনের বাইরে কোনো আলাদা জগৎ নয়। বরং মানুষের জীবন, তার সংগ্রাম, স্বপ্ন, বেদনা ও সম্ভাবনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। একটি জাতির সংস্কৃতিও কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা অভিজাত শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শ্রম, উৎসব, গান, গল্প, লোকাচার ও ঐতিহ্যের মধ্যেও সংস্কৃতির শিকড় গভীরভাবে বিস্তৃত। তাই শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে জাতীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখার মধ্য দিয়ে উদীচী সংস্কৃতির গণভিত্তিকে সামনে এনেছে।

উদীচীর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রায় অসাম্প্রদায়িকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। সাম্প্রদায়িকতা মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে; ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার মানুষের মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত করে। এর বিপরীতে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, পারস্পরিক মমত্ববোধ, যুক্তিবোধ ও সৌন্দর্যবোধ একটি মানবিক সমাজের ভিত্তি তৈরি করে। আজকের বাস্তবতায় এই সাংস্কৃতিক দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাজে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার নানা প্রকাশ যখন মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তখন সংস্কৃতির কাজ শুধু বিনোদন দেওয়া নয়; মানুষকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা।
বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, অর্জন ও চেতনা নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ানে নতুন করে বিতর্ক, আক্রোশ ও টানাপোড়েনের মুখোমুখি হচ্ছে। কখনও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন, কখনও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সংকুচিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়। এই বাস্তবতায় ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা, মুক্তিযুদ্ধের মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা যুক্তিনিষ্ঠভাবে পৌঁছে দেওয়া সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। 

মানুষের মুক্তিকে শুধু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা পূর্ণাঙ্গ মুক্তি হয়ে ওঠে না। দারিদ্র্য, বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনা মানুষের সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাকেও সীমিত করে। তাই মানুষের সাংস্কৃতিক মুক্তি তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ৫৮ বছরের পথচলায় উদীচী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণ নয়। সময় বদলায়; মানুষের জীবনযাপন বদলায়; প্রযুক্তি ও যোগাযোগের ধরন বদলায়; নতুন প্রজন্মের সামনে তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন ও নতুন সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। তাই উদীচীর সামনে আজকের চ্যালেঞ্জ হলো তার ঐতিহাসিক মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের ভাষা, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত করা।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছে। সেই বাংলাদেশকে আরও মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সৃষ্টিশীল সমাজে রূপান্তরের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেই যাত্রায় সংস্কৃতি মানুষের চেতনা, বিবেক ও ঐক্যের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
উদীচীর ৫৮ বছর তাই একদিকে সংগ্রামের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা। মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও সৃষ্টিশীলতার পক্ষে সংস্কৃতির যে অঙ্গীকার নিয়ে উদীচীর পথচলা শুরু হয়েছিল; নতুন প্রজন্মের হাতে সেই অঙ্গীকার আরও বিস্তৃত ও মানবিক রূপ লাভ করুক– ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটিই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

অমিত রঞ্জন দে: সাধারণ সম্পাদক, উদীচী

আরও পড়ুন

×