কপ ৩১
জলবায়ু অর্থায়ন আলোচনায় শিক্ষার স্থান কোথায়
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১। এ আসরের জন্য সরকার নিশ্চয় প্রস্তুত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রস্তুতিতে শিক্ষা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
বিষয়টি বোঝা যেতে পারে চলতি মাসের মাঝামাঝি আমার ঢাকার কড়াইল বস্তিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে। বনানী দিয়ে প্রবেশ করে যখন কড়াইলের বউবাজার এলাকায় পৌঁছি তখন দুপুর ১২টা। সেখানে ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যেই গড়ে উঠেছে মায়ের দোয়া বিদ্যানিকেতন অ্যান্ড হাই স্কুল। স্কুলের শিক্ষার্থী অনেকেই তখন শ্রেণি কার্যক্রমে ব্যস্ত। আবার অনেক শিশুকে দেখা গেল স্কুলের চারপাশে ঘোরাঘুরি আর খেলাধুলায় সময় কাটাতে। সবাই স্কুলে যাওয়ার বয়সী, তবে তাদের কতজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় আর কতজন ঝরে পড়েছে; বোঝার উপায় নেই। দোকানে কর্মরত এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, গ্রামে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ঢাকায় এসে এ কাজে ঢুকেছে। স্কুলটির শিক্ষকরা জানালেন, তারা সেখানকার বাসায় বাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের আনার চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছে। কারও কারও সন্তান নানা পেশায় ঢুকেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন অনেক পরিবার এসে রাজধানীর বস্তিগুলোয় আশ্রয় নেয়। ঘনবসতি ও চরম দারিদ্র্য যখন তাদের সঙ্গী তখন জলবায়ু স্থানচ্যুতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় শিকার হয় তাদের শিশুরা। পেটের টানে কিংবা পরিবারের অভাব মেটাতে বহু শিশুকে অল্প বয়সে কাজ বেছে নিতে হয় অথবা অর্থাভাবে তারা মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জলবায়ুর প্রভাবে যখন তাদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে তখন বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন এ শিশুদের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে জলবায়ুসৃষ্ট সংকট শিক্ষা খাতকে কতটা প্রভাবিত করছে, তা হয়তো আমাদের নীতিনির্ধারকরা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না। যে কারণে জলবায়ুর অর্থায়নে শিক্ষা এখনও বলা চলে উপেক্ষিত। জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বের যে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ আছে, সেখানেও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে।
এখানে অবশ্য আমরা একা নই। গত মাসে প্রকাশিত ‘লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অন ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিজরাপশনস ইন ২০২৫’ শিরোনামে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, জলবায়ুসৃষ্ট সংকটে ২০২৫ সালে ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। আক্রান্ত ১০৬টি দেশের মধ্যে ৭৫ শতাংশ দেশই মধ্যম ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
জলবায়ুজনিত কারণে পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতিও ইউনিসেফ দেখিয়েছে, যেখানে বিশ্বের প্রতি ১০ জন শিশুর একজন ক্ষতিগ্রস্ত। এটি শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়িয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ভালোভাবেই, যেখানে ২০২৫ সালের বন্যায় ১১ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে দেশব্যাপী যে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল, তাও পরে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে বাংলাদেশের ৩৫ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যাহত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সাইক্লোন বা দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে মানুষ যখন শহরের বস্তিতে উঠছে, তখন তাদের শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।
তারপরও জলবায়ু সংকটের অর্থায়ন ও অভিযোজন আলোচনায় ঘরবাড়ি হারানো, কৃষির সংকট, অবকাঠামো কিংবা জীবিকার সমস্যাই প্রধান হয়ে ওঠে। শিক্ষা এখানে জরুরি হলেও সেভাবে গুরুত্ব পায় না। সে জন্যই কপ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজনের আলোচনায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাজির করা দরকার। শুধু ফসল বা রাস্তা নয়; স্কুল বন্ধ হওয়া কিংবা শিখন ঘাটতিও জলবায়ুজনিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ হিসেবে আনতে হবে। অভিযোজন আলোচনায় জলবায়ুসহিষ্ণু স্কুল বিল্ডিং, তাপপ্রবাহ সহনীয় ক্লাসরুম ডিজাইন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু সম্মেলন বছরে একবার অনুষ্ঠিত হলেও এই সম্মেলেনকেন্দ্রিক অনেক ধরনের কাজ হয়। বাংলাদেশ যেমন সরকারিভাবে তাদের অবস্থান ও দাবি জানিয়ে থাকে, তেমনি বেসরকারিভাবেও নাগরিক সমাজ ‘পজিশন পেপার’ তৈরি এবং জলবায়ু সম্মেলনে গিয়ে তাদের পরিমণ্ডলে তা আলোচনা করে। সাংবাদিক হিসেবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জলবায়ুর এমনই এক ‘পজিশন পেপার’ তৈরির তিন দিনের কর্মশালায় থাকার সুযোগ হয়। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-সিপিআরডির নেতৃত্বে ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশের উদ্যোগে সে কর্মশালায় দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, আইএনজিও ও নাগরিক সমাজের প্রায় অর্ধশত সদস্য অংশগ্রহণ করেন। কপ৩১ সামনে রেখে সেই ‘সিএসও পজিশন পেপার’ তৈরির কর্মশালায়ও আমি জলবায়ুবান্ধব শিক্ষানীতি প্রণয়নের বিষয়টি তুলে ধরেছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে শিক্ষার ওপর পড়ছে, তা বিশ্ব অনুধাবন করছে। অন্তত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন তা বলছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ব্যবস্থা ও উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। যতদূর জানি, পরিবেশ অধিদপ্তর ‘ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ফর লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ প্রস্তুত করছে, সেখানে শিক্ষার ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে হাজির করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) রয়েছে, যেখানে শিক্ষার মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ও আছে। কিন্তু শিক্ষাও অর্থনৈতিক ক্ষতির অংশ– ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। তারা যেভাবে জলবায়ুসৃষ্ট সংকটে শিক্ষার অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছে, তাকে ধরে জাতীয়ভাবেও আমাদের ক্ষতি বের করে আনা উচিত, যাতে বিশ্বনেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় এনে ক্ষতিপূরণ দানে বাধ্য করা যায়।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
- জলবায়ু
- শিক্ষা