ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ফরাসি সরকারের ‘দাঙ্গা’ বয়ান

ফরাসি সরকারের ‘দাঙ্গা’ বয়ান
×
×

রোখাইয়া ডায়ালো

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফ্রান্সের সহিংস অস্থিরতার ছবিগুলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙচুর করা দোকানের জানালা, ধ্বংস হওয়া সম্পত্তি, লুটপাটের ঘটনা এবং ভয়াবহ আগুন ন্যায়সংগতভাবেই ক্ষোভ ও নিন্দার কারণ হয়েছে। অপরাধীদের নেপথ্য উদ্দেশ্যে কেবল একটি ব্যাখ্যা নেই। এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া কিছু সুবিধাবাদী ‘অপরাধী চক্র’ অবশ্যই সেখানে রয়েছে। এর পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে জীবনযাত্রার মানের অবনতি হওয়ায় এবং পরিবর্তনের দাবিগুলোর কোনো সাড়া না মেলায় পুঞ্জীভূত জনরোষও বিস্ফোরিত হয়েছে।

ফরাসি সরকার এই সহিংসতার পুরোপুরি সুযোগ লুফে নিয়েছে। প্রতিবাদ দমনে তাদের অতিরিক্ত বল প্রয়োগের পক্ষে সাফাই গাইতে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে জনসমক্ষে জবাবদিহি এড়াতে তারা এ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করেছে। বিশৃঙ্খলার এই ছবিগুলো ক্ষমতাসীনদের এমন এক জনশৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে জাহির করার সুযোগ করে দেয়, যে শৃঙ্খলা ধ্বংস করতে তারা নিজেরাই সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তবে এই সহিংসতার ঘটনাগুলো ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক গণবিক্ষোভের পেছনের আসল কারণগুলোকে কোনোভাবে অবৈধ বলে সাব্যস্ত করতে পারে না। পাশপাশি পুলিশ যে নির্মম সহিংসতা চালিয়েছে, তা থেকেও দৃষ্টি সরানোর সুযোগ নেই। 

ফরাসি অর্থনীতিবিদ লুকাস শাঁসেলের মতে, ২০১৭ সালে ইমানুয়েল মাখোঁ ক্ষমতায় আসার পর মাথাপিছু সরকারি শিক্ষা ব্যয় ২০ শতাংশ কমে গেছে। ফরাসি শিক্ষার্থীরা ক্ষমতাধরদের এই কাঠামোগত সহিংসতার অবসান ঘটাতে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু কথা শোনার পরিবর্তে সরকার দমনপীড়ন ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নিয়েছে। জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ জানিয়েছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু পুলিশ অফিসারদের প্রতি তিনি যেভাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন; শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সেভাবে সমর্থন দেননি। শুক্রবার ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এক বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্ল্যাটফর্ম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলোর সমাধান নয়।

মাখোঁ নিরাপত্তা নিশ্চিতের এই তথাকথিত ‘সমাধান’-এর ওপরেই জোর দিয়ে চলেছেন, যার অংশ হিসেবে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন এবং বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ‘অতি ডানপন্থি’দের বিরুদ্ধে ‘প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করা’র চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েল লেকোর্নু বামপন্থিদের ‘একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পুলিশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী; দাঙ্গাবাজরা তাদের ‘সহিংস এজেন্ডা’র প্রতিনিধিত্ব করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, যেন কোনো বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানেই রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ।
এ ধরনের বাগাড়ম্বর মাখোঁর রাজনৈতিক শিবিরকে বেশ সুবিধা দিচ্ছে। কারণ এটি তাদের বারবার অতি ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়, যেখানে সাধারণ মানুষকে সুশাসন দেখানোর পরিবর্তে ভয়ের বশবর্তী হয়ে সরকারের পেছনে সমবেত হতে বলা হয়। ভোটারদের সামনে এখন একটি চরম হতাশার পথ খোলা রয়েছে– হয় তাদের পক্ষে দাঁড়ানো, যারা তাদের ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে, অথবা তাদের; যারা এই ক্ষোভকে জাতিগত ঘৃণায় রূপ দিতে চাইছে।

এই মুহূর্তে এটা স্পষ্ট, সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আন্তরিকভাবে সমাধানে মোটেও আগ্রহী নয়। তা করতে গেলে মাখোঁর প্রেসিডেন্সির মূল অগ্রাধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হতো, যাতে অল্প কিছু মানুষের সম্পদ রক্ষা পায় আর বেশির ভাগ মানুষ অবহেলিত থাকে।
এর পরিবর্তে সরকার শুধু আন্দোলনটি নিজে থেকেই ঝিমিয়ে পড়া, ভয়ে দুর্বল হয়ে পড়া অথবা বিশৃঙ্খলার কারণে মানুষের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থেমে যাওয়ার অপেক্ষা করবে। তবে এ কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য। এমনকি এই আন্দোলন যদি ঝিমিয়ে পড়ে, তাহলে অচিরেই অন্য একটি আন্দোলন তার জায়গা নেবে। জীবনযাত্রার মানের ক্রমাগত অবনতির মুখে ফরাসি জনগণকে চিরকাল ভয় দেখিয়ে অবদমন করে রাখা যাবে না।

রোখাইয়া ডায়ালো: ফরাসি সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×