ইসলাম ও সমাজ
গিবত ও পরনিন্দার পরিণাম
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
গিবত ও পরনিন্দা আমাদের সমাজের একটি নীরব মহামারি। আমরা একে খুব হালকা মনে করি, আড্ডার ছলে করে ফেলি। কিন্তু ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ এবং জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ। গিবতের সংজ্ঞা রাসুল (সা.) নিজেই দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো, গিবত কী?’ সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বললেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞেস করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে থেকেও থাকে? তিনি বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তো গিবত করলে। আর যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তো তুমি তার ওপর অপবাদ দিলে।’ (সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে– সেটাই গিবত। পরনিন্দা বা বুহতান হলো কারও নামে মিথ্যা দোষ রটানো, যা তার মধ্যে নেই। এটি গিবতের চেয়েও জঘন্য। আল্লাহ সুরা হুজুরাতের ১২ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো।’ হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি) গিবত বা পরনিন্দা করলে বান্দার নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়। মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, কিছু লোক তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছে। জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘এরা হলো তারা যারা মানুষের গোশত খেত। অর্থাৎ গিবত করত এবং তাদের সম্মানে আঘাত করত।’ (আবু দাউদ) কিয়ামতের দিন গিবতকারী তার নেকি দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দেবে। যার গিবত করেছে, তার গুনাহ নিজের কাঁধে নিতে হবে। একে বলা হয় দেউলিয়া।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত দেউলিয়া সে-ই, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাত নিয়ে আসবে কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও গিবত করেছে, কারও সম্পদ খেয়েছে। তখন তার নেকি থেকে তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে; অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম) অপর হাদিসে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এদের কবরে আজাব হচ্ছে। বড় কোনো কারণে নয়। একজন প্রস্রাব থেকে পবিত্র থাকত না, আরেকজন চোগলখোরি করে বেড়াত।’ (সহিহ বুখারি)
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ৬টি ক্ষেত্রে প্রয়োজনবশত গিবত করা জায়েজ। ১. জুলুম থেকে বাঁচতে বিচারকের কাছে জালিমের বিরুদ্ধে নালিশ করা; ২. অন্যায় পরিবর্তনের জন্য প্রশাসনের কাছে গিয়ে অন্যায় কাজের প্রতিকার চাওয়া; ৩. ফতোয়া জানার জন্য মুফতির কাছে বলা– ‘আমার ভাই আমার ওপর এমন করেছে’; ৪. মুসলমানকে সতর্ক করতে যেমন– ব্যবসায় কেউ প্রতারণা করে, বিয়ের পাত্র খারাপ, হাদিস বর্ণনাকারী মিথ্যুক– এদের সম্পর্কে সতর্ক করা; ৫. প্রকাশ্য পাপী যেমন– যে প্রকাশ্যে মদ খায়, সুদ খায়, তার প্রকাশ্যে পাপ নিয়ে বলা; ৬. পরিচয় প্রদানের জন্য। কেউ খোঁড়া, কানা নামে পরিচিত হলে পরিচয়ের জন্য বলা; হেয় করার জন্য নয়। এ ছাড়া সব গিবত হারাম।
গিবত থেকে বাঁচার উপায়। ১. মনে রাখতে হবে, আল্লাহ সব শুনছেন; ২. কারও দোষ দেখলে গোপনে তাকে সংশোধনের নিয়তে বলুন, অন্যের কাছে নয়; ৩. গিবতের মজলিসে থাকলে তার প্রতিবাদ করুন বা স্থান ত্যাগ করুন। আল্লাহ বলেন, যখন দেখবে আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা হচ্ছে, সেখান থেকে উঠে যাও; ৪. বেশি বেশি জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখুন।
৫. গিবত করে ফেললে যার গিবত করেছেন, তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উত্তম। যদি ক্ষমা চাইতে গেলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং তার প্রশংসা করুন।
আমাদের জিহ্বা একটি ছোট অঙ্গ। কিন্তু এর অপরাধ অনেক বড়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে গিবত ও পরনিন্দার মতো জঘন্য পাপ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার