পাবলিক পরীক্ষা
ফলের অঙ্কের আড়ালে শিক্ষাব্যবস্থার বড় প্রশ্ন
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হওয়া উচিত কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল?
মোশাররফ তানসেন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫৮
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট ও সমমান পরীক্ষার ফল আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা হাজির করেছে। এ বছর মোট পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত বছর এই হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২৫ সালের ৬৯,০৯৭ থেকে কমে এ বছর হয়েছে ৪০,০৮৪ – প্রায় ৪২ শতাংশের পতন।
এই সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু আরও উদ্বেগের বিষয় হবে যদি আমরা ফলকে শুধু ‘পাসের হার কমেছে’– এই একটি বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখি। কারণ একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনোই একটি শিক্ষাব্যবস্থার সম্পূর্ণ চিত্র নয়। বরং ফলাফল হলো সেই ব্যবস্থার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০২৬ সালের ফল তাই আমাদের সামনে সবচেয়ে জরুরি যে প্রশ্নটি রাখে তা হলো– কেন এত শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলো এবং এই ব্যর্থতার প্রকৃতি কী? শিক্ষার্থীরা কি যথেষ্ট শেখেনি, নাকি আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা তাদের শেখার প্রকৃত সক্ষমতা ধরতে পারছে না? নাকি দুটো সমস্যাই একই সঙ্গে কাজ করছে?
মাত্র দুই বছরের মধ্যে পাসের হার প্রায় ২৬ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে জিপিএ৫-এর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই প্রবণতাকে কেবল একটি কঠোর পরীক্ষাবর্ষের ফল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। বরং এটি আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
তবে পাসের হার কমেছে বলেই শিক্ষার মানও কমেছে এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। একইভাবে কম জিপিএ৫ পাওয়াকে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার একমাত্র প্রমাণ হিসেবেও দেখা যাবে না। যদি পরীক্ষার প্রশ্ন মুখস্থনির্ভরতা থেকে ধারণা বোঝা, বিশ্লেষণ, যুক্তি, প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে একটি পর্যায়ে ফলাফল কমতে পারে। সেটি সবসময় নেতিবাচক নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো, মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান কি পরিবর্তিত হয়েছে? শিক্ষকদের কি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে? শিক্ষার্থীদের কি নতুন ধরনের প্রশ্ন ও শেখার পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করা হয়েছে? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে পরীক্ষায় ব্যর্থতার দায় শুধু শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো অন্যায্য।
বাংলাদেশের অনেক শ্রেণিকক্ষে এখনও শিক্ষার একটি প্রচলিত মডেল কার্যকর– শিক্ষক পড়াবেন, শিক্ষার্থী শুনবে, নোট নেবে এবং পরীক্ষার আগে তা মুখস্থ করবে। এই পদ্ধতি হয়তো নির্দিষ্ট ধরনের পরীক্ষায় নম্বর তুলতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে এটি যথেষ্ট নয়। আজকের শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মনে রাখলেই হবে না; তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, যুক্তি দিয়ে মতপ্রকাশ করতে হবে, দলগতভাবে কাজ করতে হবে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে হবে। তাই এইচএসসির ফল উন্নত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ সম্ভবত ‘আরও বেশি পড়ানো’ নয়, বরং ‘আরও ভালোভাবে শেখানো’।
২০২৬ সালের ফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মেয়েদের তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স। তবে জিপিএ৫-এর ক্ষেত্রে ছেলেরা সামান্য এগিয়ে। এই ফলকে আমরা শুধু ‘মেয়েরা ভালো করেছে’ বলে উদযাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং আমাদের জানতে হবে কেন মেয়েদের পাসের হার ছেলেদের তুলনায় এত বেশি এবং কেন ছেলেদের একটি বড় অংশ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, সামাজিক প্রত্যাশা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বিনোদনের ব্যবহার, কিশোরদের মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সম্পর্কে তাদের ধারণার মতো নানা বিষয় জড়িত থাকতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। ছেলেদের কম পাসের হারকে শুধু ‘পড়াশোনায় অনাগ্রহ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে আমরা সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে পাব না।
আরও উদ্বেগজনক হলো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈষম্য। এ বছর ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১টি বেড়েছে। বিপরীতে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০২৫ সালের ৩৪৫ থেকে কমে এ বছর হয়েছে মাত্র ১৩৯টি।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে। জাতীয় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ– এই গড়ের আড়ালে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রায় সবাই পাস করেছে, আবার এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হয়নি। তাই শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের দায়ী করে বিষয়টি শেষ করা যাবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জানতে হবে শিক্ষক সংখ্যা ও শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকতার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষা উপকরণ, ল্যাবরেটরি, পাঠাগার, ডিজিটাল সুবিধা, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের অবস্থা কী। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, তাদের সাফল্যের কারণও চিহ্নিত করতে হবে।
২০২৬ সালের পরীক্ষা পরিচালনাও পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশেষ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে পরে অনুষ্ঠিত হয়। ব্যবহারিক পরীক্ষা ১৫ আগস্টের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। এই ধরনের বিঘ্ন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, মানসিক চাপ এবং একাডেমিক ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব কারণকে ফলাফলের পতনের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করাও যথার্থ হবে না। কারণ ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ফলাফলের ধারাবাহিক পরিবর্তন আমাদের আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যার দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।
এখন সবচেয়ে প্রয়োজন ফল প্রকাশের সংস্কৃতি থেকে ফল বিশ্লেষণের সংস্কৃতিতে যাওয়া। প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর আমরা পাসের হার, জিপিএ৫ এবং বোর্ডভিত্তিক সাফল্য নিয়ে আলোচনা করি; কয়েক দিন পর বিষয়টি সংবাদচক্র থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত কাজ তখনই শুরু হওয়া উচিত। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে? কোন ধরনের প্রশ্নে তাদের দুর্বলতা বেশি? দুর্বল ফল করা শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে পড়েছে? তাদের শেখার ঘাটতি কোথায়? কোন অঞ্চল বা আর্থসামাজিক গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ফলাফলকে শিক্ষা সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে ফেল করা শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থী অযোগ্য এমন ধারণা শিক্ষাবান্ধব নয়। কারও ভিত্তিগত জ্ঞান দুর্বল হতে পারে, কারও নির্দিষ্ট বিষয়ে শেখার ঘাটতি থাকতে পারে, আবার কেউ পারিবারিক, অর্থনৈতিক বা মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। তাই পুনঃপরীক্ষার সুযোগের পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল লার্নিং রিকভারি, রিমেডিয়াল এডুকেশন, একাডেমিক কাউন্সেলিং ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স এর ব্যবস্থা করা দরকার। একজন শিক্ষার্থীর একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা যেন তার জীবন ও ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত না করে।
একই সঙ্গে আমাদের এইচএসসির উদ্দেশ্য নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার একটি সিঁড়ি, নাকি এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্মজগতের জন্য প্রস্তুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল ও তথ্য-সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধান, আর্থিক সাক্ষরতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, নাগরিক দায়িত্ব, দলগত কাজ ও উদ্যোক্তা দক্ষতার মতো বিষয়কে শিক্ষার মূলধারায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে পারে না।
২০২৬ সালের ফল তাই একই সঙ্গে সতর্ক সংকেত এবং সংস্কারের সুযোগ। আমাদের এখন একটি গভীর ও তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন, যেখানে প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন, শিক্ষক সক্ষমতা, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈষম্য, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি এবং লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হবে। দুর্বল শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মশালা না রেখে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হওয়া উচিত কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল? একটি দেশের ভবিষ্যৎ জিপিএ৫ এর সংখ্যায় তৈরি হয় না; তৈরি হয় এমন তরুণদের দিয়ে যারা প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। ২০২৬ সালের এইচএসসির ফল আমাদের সেই মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি এই ফলকে আরেকটি বার্ষিক পরিসংখ্যান হিসেবে ভুলে যাব, নাকি এটিকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত, দক্ষ ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করব?
মোশাররফ তানসেন : পিএইচডি গবেষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, মালালা ফান্ড
- বিষয় :
- এইচএসসি ও সমমান
- এইচএসসির ফল