ছাত্রদল-শিবির বিরোধে শিক্ষাঙ্গনে উত্তেজনা
নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মনোগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘গুপ্ত’ শব্দ নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বাগ্যুদ্ধ গড়িয়েছে সংঘাতে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনায় সংঘর্ষ হয়েছে। ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েক দিনে দেশের শিক্ষাঙ্গনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শব্দের প্রয়োগ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে দেখা গেলেও এর পেছনে রয়েছে শিক্ষাঙ্গনের নিয়ন্ত্রণ। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষাঙ্গনে শিবিরের একক অবস্থান তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলও চেষ্টা করছে সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি করতে।
দুই সংগঠনের সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সংসদে বাহাসে জড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘অভিভাবক’ দলগুলোর মধ্যে আলোচনার আভাস না থাকায় ছাত্রদল এবং শিবিরের উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা স্থায়ী হবে কিনা সংশয় রয়েছে।
তবে তিন দিনের উত্তজেনার পর গতকাল শুক্রবার উভয় সংগঠন সংযম দেখিয়েছে। সূত্র জানায়, ছাত্রদলের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংগঠনের নেতাদের সহনশীলতা দেখাতে হবে। শিবির জানিয়েছে, আলোচনার আহ্বান পেলে সংলাপে আগ্রহী তারা।
পুরোনো বিরোধ, ৫ আগস্টের পর বেড়েছে
১৯৯৯ সালে গঠিত বিএনপি ও জামায়াতের জোট ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হলেও ছাত্রদল এবং শিবিরের মিত্রতা ছিল না। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠিত হলেও ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তা ভেঙে যায়। জোট সরকারের সময় বিভিন্ন ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রদল এবং শিবিরের সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনা ছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেও ছাত্রদল এবং শিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে বারবার। দুই পক্ষেরই প্রাণহানি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই বিতাড়িত ছিল ছাত্রদল এবং শিবির। তারপরও ঐক্য ছিল না। ছাত্রদল নেতারা দলীয় পরিচয়ে ঝটিকা কর্মসূচি করলেও শিবির তা পারেনি। শিবির সন্দেহে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নিপীড়ন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেই সময়ে শিবিরের অনেকে ছাত্রলীগে ঢুকে ক্যাম্পাসগুলোতে ছিলেন। এই কৌশলকে গুপ্ত বলছে ছাত্রদল। যদিও এই ভাষ্যকে বরাবরই নাকচ করছে শিবির।
৫ আগস্টের পর অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়। যারা এই দাবিতে সামানের দিকে ছিলেন, তাদের অনেকে শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়। ছাত্রদলের ভাষ্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের নামে শিবির ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। হলগুলোতে তাদের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন।
তবে শিবিরের দাবি, ছাত্রদলের অধিকাংশ নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের কেউ নিয়মিত ছাত্র নন। ছাত্রত্ব না থাকায় তারা আবাসিক হলে ওঠার যোগ্য নন। এ কারণেই ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা বাধা তৈরি করেন।
রাজনৈতিক বয়ান থেকে সংঘর্ষ
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর শিবিরের একক অবস্থান ভেঙে ছাত্রদল শিক্ষাঙ্গনে অবস্থান তৈরির চেষ্টা করায় গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষে ছড়ায় তারা। ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ দেয়াল লিখন থেকে একটি শব্দ মুছে ছাত্রদল ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ’ লেখায় তর্কবিতর্ক হয়। পরে সংঘর্ষ বাধে। ছাত্রদলের দুই নেতাকে দেশীয় অস্ত্র হাতে দেখা যায় সংঘর্ষের সময়। শিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীকে লাঠিসোটা হাতে দেখা যায়।
পরের দিন দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে দেয়ালে গুপ্ত লেখে ছাত্রদল। উত্তেজনা বাড়ে একটি স্ক্রিনশট ঘিরে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার দুলালপুর ইউনিয়ন সভাপতি গাজী আশরাফুল ইসলাম শ্রাবণ নিজের ভেরিফায়েড প্রোফাইলে একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করে দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর মেয়ে জাইমা রহমান সম্পর্কে ঢাকার শিবির কর্মী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ অশালীন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে ছাত্রদলের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ছাত্রদলের অনেকে এই পোস্ট শেয়ার করেন। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছাত্রলীগ নেতা শ্রাবণের পোস্ট করা স্ক্রিনশটটি ভুয়া। ‘এহসান চৌধুরী’ নামের প্রোফাইল থেকে এআই দিয়ে তারেক রহমান এবং জাইমা রহমানের অশালীন ছবি পোস্ট করা হয়। তবে সম্পাদনা করে ‘এহসান চৌধুরী’র জায়গায় আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নাম বসিয়ে দেওয়া হয়।
মাহমুদ এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে ছাত্রদলের কর্মীরা সেখানে যান। তাঁকে উদ্ধারে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মুহাম্মদ থানায় যান। এর আগে এবি জুবায়ের ‘ছাত্রদল ক্যাম্পাসে কিরিচ-চাপাতির রাজনীতি আনতে চায়’ লেখেন ফেসবুকে। থানায় থাকা ছাত্রদল কর্মীরা বেধড়ক মারধর করে জুবায়ের এবং মুসাদ্দিককে। তাদের উদ্ধার করেন ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। শিবির এ ঘটনাকে ছাত্রলীগ জামানায় ফেরার প্রমাণ হিসেবে দেখাতে চাইছে।
এ পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় ছাত্রদল জরুরি সভায় বসে। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে অপ্রকাশ্য রাজনীতির বিষয়ে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে। নেতাদের সহনশীল থাকা এবং ক্যাম্পাস স্থিতিশীল রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাচ প্রতিনিধিতে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর হলগুলোতে ‘ব্যাচ প্রতিনিধি’ হিসেবে নিজেদের নেতাকর্মী নির্বাচন করে শিবির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরে ডাকসু নির্বাচনে ব্যাচ প্রতিনিধিরা শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রকাশ্যে আসেন। ছাত্রদের হল সংসদে সিংহভাগ শিবির সমর্থিত প্যানেল জয়ী হয়েছে।
তারা আগে থেকে রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর নেতা জাবির আহমেদ জুবেল, ছাত্রদল নেতা আবুজর গিফারী, উবায়দুল্লাহ রিদওয়ানসহ একাধিক ছাত্রদল নেতাকে ‘রাজনীতিতে যুক্ত’ দাবি করে উঠতে দেয়নি ব্যাচ প্রতিনিধিরা। তবে পরে তারা হলে উঠেছেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রদলের দীর্ঘদিন কমিটি না থাকা, ছাত্রত্ব না থাকা নেতাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় এখনও অবস্থান দুর্বল।
‘গুপ্ত রাজনীতি’ বন্ধের দাবি তোলা ছাত্রদলের চাওয়া, শিবিরের সব কর্মী ও সমর্থকের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। এ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে শিবির শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ এবং ডাকসুর মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের পাঠকক্ষে এসি স্থাপন, বিভিন্ন হলে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে।
ঢাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আনিসুর রহমান অনিক খন্দকার সমকালকে বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিনয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মতপ্রকাশের নামে অনেক সময় অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে, যা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অনুকূল নয়।
তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবারের ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের ‘মবোক্রেসি’ ও বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে। আমরা সাংগঠনিক বৈঠক করেছি, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং ক্যাম্পাস যেন স্থিতিশীল থাকে। আমরা অসম লড়াইয়ে রয়েছি। জানি না আমাদের প্রতিপক্ষ কারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিক সমকালকে বলেন, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও সবার সহাবস্থান চাই। কিন্তু ছাত্রদল সহিংসতা দেখিয়ে একক রাজনীতি চায়। শিবির শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, বিভিন্ন জনস্বার্থমূলক ইস্যুতে প্রকাশ্য কার্যক্রম থাকে। পাশাপাশি কর্মী ও সদস্যদের দক্ষতা ও মানোন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়, যা সবসময় প্রকাশ্যে আনা হয় না।
সব কর্মী-সমর্থকের নাম-পরিচয় প্রকাশের বিষয়ে কাজী আশিক বলেন, কোনো সংগঠনেই কি কমিটির বাইরে কারও তালিকা থাকে? শত শত কর্মীর নাম প্রকাশ করা হয় না। কর্মীরা সংগঠনের কর্মসূচিতে কার্ড ঝুলিয়ে অংশ নেন। এ নিয়ে যে ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলা হয়, তা বয়ান মাত্র।
ছাত্রদলের সভার পর সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, অধিকাংশ ক্যাম্পাসে শিবিরের মাত্র দুই, চার, পাঁচ সদস্যের কমিটি থাকলেও বাকিরা সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করছে। ছাত্রদলকে হেনস্তা করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি।
শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, ছাত্রদল সভাপতি যদি আলোচনার আহ্বান জানান, তাহলে সংলাপের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।
এদিকে শুক্রবার যশোরে শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ক্যাম্পাসগুলোতে পায়ে পা দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে ছাত্রদল।
