ঢাকা-৫ উপনির্বাচন
প্রার্থীর পক্ষে এখনও আ'লীগের অনেক নেতা মাঠে নামেননি
মনিরুল ইসলাম মনু
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪:৫৩
ঢাকা-৫ (ডেমরা-যাত্রাবাড়ী-কদমতলী আংশিক) আসনের উপনির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। দলীয় প্রার্থী যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর পক্ষে এখনও মাঠে নামেননি অনেক নেতা। মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেও অনেক নেতা মাঠে নামছেন না তার পক্ষে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচারাভিযান শুরু হলে সবাই বিভেদ দূরে ঠেলে নৌকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনের প্রস্তুতি অবশ্য সব দলের প্রার্থীরাই নিতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্প নির্মাণের কাজও করছেন প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর অনুসারীরা। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কার্যক্রম শুরু করতে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার কার্যক্রমে স্থানীয়ভাবে প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ মুন্নাকে, যিনি নিজেও এই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
কয়েকজন নেতা বলছেন, ঢাকা-৫ আসনে গত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান মোল্লা এমপি নির্বাচিত হলেও এলাকাটি অনেকটাই 'বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি' হিসেবে পরিচিত। আগামী ১৭ অক্টোবরের উপনির্বাচনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী ও দলের বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদও এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। এই আসনের তিনবারের সাবেক এমপি ও হেভিওয়েট প্রার্থী সালাহউদ্দিনের পক্ষে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সর্বস্তরের নেতাকর্মী। এ নির্বাচনী এলাকায় ১৭২টি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলোর সিংহভাগই মূলত জামায়াত-হেফাজত নিয়ন্ত্রিত। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রচুর ভোটও বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে যাবে। ইভিএমে ভোট গ্রহণ হওয়ায় 'নীরবে' ধানের শীষের পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেও শুরু করেছেন এলাকার সরকারবিরোধী ভোটাররা।
এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের সব নেতার পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের সব শরিক দলকে মাঠে নামানোর উদ্যোগ এ পর্যন্ত চোখে পড়েনি। এ ছাড়া হাবিবুর রহমান মোল্লা এমপি থাকার সময় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডসহ নানা অভিযোগ থাকায় এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাবও রয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রয়াত এমপি ও তার পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব এবং দলের মধ্যে বিভক্তিও দীর্ঘদিনের। এই অবস্থায় চার-পাঁচটি ধারায় বিভক্ত আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির বিবদমান সব পক্ষকে অচিরেই সর্বাত্মকভাবে নির্বাচনী প্রচারকাজে নামাতে না পারলে এই আসনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনা অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এদিকে, প্রয়াত এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লার ছেলে ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ মশিউর রহমান মোল্লা সজলের বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থীর প্রতি বিরূপ আচরণের অভিযোগও উঠেছে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনু প্রয়াত হাবিবুর রহমান মোল্লার সূত্রাপুরের বাসায় গিয়ে তার ছেলে সজলের সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রায় আধাঘণ্টা বাড়ির গেটে দাঁড় করিয়ে রাখার পরও সজল কিংবা তার পরিবারের কোনো সদস্যই মনু ও তার সঙ্গে যাওয়া যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ মুন্না, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর হাজী আবুল কালাম অনুসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ফুলের তোড়া ও মিষ্টি প্রয়াত এমপির সাবেক পিএস জামাল উদ্দিন পাটোয়ারীর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে হয় মনুসহ নেতাদের। দলীয় প্রার্থী ও স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করে সজল রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ দেখিয়েছেন- এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ জানিয়েছেন দলের কয়েকজন নেতা।
মশিউর রহমান মোল্লা সজল প্রয়াত বাবার স্থলাভিষিক্ত হতে ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু এলাকায় সজল ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও জনমনে নেতিবাচক ইমেজ থাকায় তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি বলে একাধিক সূত্রের দাবি। যদিও মনোনয়ন পেতে দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা ও নীতিনির্ধারকদের কাছে লবিং-তদবির করেন সজল।
মশিউর রহমান মোল্লা সজল অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে সমকালকে বলেন, দলীয় প্রার্থী ও তার সঙ্গের নেতারা আগে থেকে জানিয়ে তাদের বাসায় যাননি। তারা যখন দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন তার আম্মা (প্রয়াত এমপির স্ত্রী) এবং তিনিসহ (সজল) পরিবারের কোনো সদস্যই বাসায় ছিলেন না। জামাল উদ্দিন পাটোয়ারীর ফোনে নেতাদের আসার খবর পেয়ে যথাযথভাবে আদর-আপ্যায়নের নির্দেশও দেন তিনি। আর আধাঘণ্টা নয়, মাত্র ৫-৭ মিনিট অপেক্ষা করেই ফিরে যান দলীয় প্রার্থী ও সঙ্গের নেতারা।
দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে না নামার অভিযোগ অস্বীকার করে সজল বলেন, এই অভিযোগও সঠিক নয়। ইতোমধ্যে সব নেতাকর্মীকে ডেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বাত্মক নির্বাচনী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আজও (গতকাল শুক্রবার) তার এলাকায় দলীয় প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও প্রধান সমন্বয়ক হারুনুর রশীদ মুন্নার উপস্থিতিতে নৌকা প্রতীকের পক্ষে যে নির্বাচনী ক্যাম্পের উদ্বোধন হয়েছে, সেখানেও উপস্থিত থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন তিনি।
এদিকে, দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত ও প্রভাবশালী অন্য কয়েকজন নেতার আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে মাঠে না নামার ইঙ্গিত মিলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন নেতার অভিযোগ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খান মাসুদ, সিনিয়র সহসভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর আতিকুর রহমান আতিক এবং আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য নেহরীন মোস্তফা দিশি এখনও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে তৎপর হননি। তবে এই তিন নেতা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রচারকাজ শুরু হওয়া মাত্রই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বাত্মকভাবে মাঠে থাকবেন তারা।
ঢাকা-৫ আসনের নির্বাচনী পরিচালনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এবং দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক অবশ্য বলেছেন, ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে নামার প্রস্তুতি অনেকটাই গুছিয়ে এনেছেন তারা। আনুষ্ঠানিক প্রচারাভিযান শুরু হওয়ামাত্রই সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে নিয়ে মাঠে নামা হবে। আর একবার প্রচার শুরু হলে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব-কোন্দলই থাকবে না। সব বিভেদ দূরে ঠেলে সব নেতা ও মনোনয়নপ্রত্যাশীই নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
- বিষয় :
- ঢাকা-৫ উপনির্বাচন
- ঢাকা-৫
- উপনির্বাচন
- আ'লীগ
