রাজনীতি
নাটকীয়তার পর পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন
দল ও সরকারকে বিব্রত না করতেই পদত্যাগ
জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নানা নাটকীয়তার পর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ ঘোষণা দেন। নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করেন। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে। গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন আহমেদ আযম খান আর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ইশরাক হোসেন। একটি সূত্র জানায়, সকালেই পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করা হয়। পরে সেটি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছে দেন ইশরাক হোসেন।
গত শনিবার রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান চালান ইশরাক হোসেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি এবং সরকারের ভেতরে অস্বস্তি ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে গত রোববার ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, আমার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে না যায়, সে জন্য আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এর আগে ইশরাকের পক্ষ থেকে পদত্যাগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলা হয়েছিল, পদত্যাগের খবর গুজব, বিভ্রান্তিকর। গত রোববার রাতে তিনি এ নিয়ে একাধিকবার অডিও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দেন। তবে সকালে তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পদত্যাগ বিষয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দেন।
সময়ের আগেই প্রেস ক্লাবে ইশরাক
নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই সংবাদ সম্মেলনের জন্য প্রেস ক্লাবে আসেন ইশরাক। এ সময় তাঁর সঙ্গে শত শত নেতাকর্মী ছিলেন। প্রেস ক্লাবে আসার পর নেতাকর্মীরা ইশরাকের পক্ষে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। নেতাকর্মীর কারও কারও হাতে ফুলের তোড়াও দেখা যায়। ইশরাক প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে এলে নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এরপর নেতাকর্মীবেষ্টিত হয়ে প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় আবদুস সালাম হলে যান তিনি। তখনও হলের ভেতরে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন নেতাকর্মীরা।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, আজ থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাঁকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মত হয়েছেন। আমাকে সুযোগ করে দিয়ে বলেছেন, ঠিক আছে যাও, এলাকায় কাজ করো।
আবারও অস্ত্রকাণ্ডের পক্ষে কথা বলে ইশরাক বলেন, যদি আমার মাধ্যমে কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি শুধু নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্র যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম। পরে সেটি আর দৃশ্যমান হয়নি।
ইশরাক হোসেন আরও বলেন, আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করতে এসেছি, যা দু-তিন দিন ধরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিছু সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত নানা ধরনের খবর প্রকাশ পেয়েছে। আমি আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি মূলত ওই দিন ঠিক কী ঘটেছিল, সেটির বিস্তারিত তুলে ধরতে।
মাদকবিরোধী অভিযান পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ছিল উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, আমরা থানাকে জানিয়ে সেখানে যাই। আমার লাইসেন্স করা অস্ত্র সব সময় কোমরে থাকে। আমি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিই, যাতে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে রক্ষা করতে পারি।
ওই ঘটনার পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বলে জানান ইশরাক। তিনি বলেন, এরপর রাতে দেখতে পান, একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন শিরোনামে প্রতিবেদন হয়েছে। ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী ১৩টি জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন, যেটি প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু তাঁর (ইশরাক) ঘটনা গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর ঘটনাগুলো ঢাকা পড়েছে।
পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে মাদকের ভয়াবহতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করে ইশরাক জানান, সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করতে চান। তাঁর কারণে যাতে প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়ে যায়, সে কারণেই এ কথা বলেছেন। তবে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান চলবে বলে ঘোষণা দেন ইশরাক।
মেয়র নির্বাচন করতে শতভাগ প্রস্তুত
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে আমার মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যদি দলের অন্য কাউকেও প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে তাঁকে জেতানোর জন্যও শতভাগ প্রস্তুত আছি।
সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাব ভবনের তিনতলা থেকে নেমে আসেন ইশরাক। এ সময়ও নেতাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে নিজের গাড়িতে চড়ে নেতাকর্মীর উদ্দেশে হাত নাড়েন ইশরাক। এক পর্যায়ে গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। সেখানে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন এই সংসদ সদস্য।
বক্তব্য শেষে গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীদের অভিবাদন জানিয়ে বেলা ৩টার দিকে প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে বেরিয়ে যান ইশরাক হোসেন। তাঁকে বহনকারী গাড়ি শিক্ষা ভবন হয়ে সচিবালয়ের পথে যায়। এরপর জিরো পয়েন্ট ধরে গোপীবাগের দিকে যান ইশরাক। এ সময়ও তাঁর সঙ্গে নেতাকর্মীরা ছিলেন।
নিজেই খুললেন গাড়ি থেকে সরকারি স্টিকার
নিজ বাড়ি থেকে গতকাল দুপুরে প্রেস ক্লাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে নিজ হাতে সরকারি স্টিকার (লোগো) খোলেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দল চায়নি, নিজে থেকেই পদত্যাগ করছি। বিশেষ কারণে পদত্যাগ করতে হচ্ছে। তবে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলবে।
ইশরাকের স্ত্রীর পোস্ট
ইশরাকের পদত্যাগ ঘোষণার পর তাঁর স্ত্রী ব্যারিস্টার নুসরাত খান নিজের ফেসবুক পোস্টে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। পোস্টের বাংলা অর্থ হলো– ‘ক্ষমতাকে যথাযথভাবে বুঝলে তা হলো লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে যে শক্তির প্রয়োজন, ক্ষমতা মূলত সেটিই।’ উদ্ধৃতিটির সঙ্গে ইশরাকের একটি ছবিও যুক্ত করেছেন তিনি।
বিতর্ক পিছু ছাড়েনি
বিএনপি নেতারা জানান, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ভণ্ডুল করে দিয়ে দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে। ওই দিন সন্ধ্যার পর তথাকথিত ‘জো বাইডেনের উপদেষ্টা’ মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফীকে নিয়ে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিতর্কের মুখে পড়েন ইশরাক। দায় এড়াতে ওই সময় দলের পক্ষ থেকে আলাদা বিবৃতি দিতে হয়েছিল। যদিও ২০২৪ সালের মে মাসে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার আদালত ইশরাকের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়। এই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এক বিতর্কিত অভিনেতার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া এবং তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার কারণে সামাজিক মাধ্যমে ইশরাক তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে তিনি সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপত্র পোস্ট করেন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইশরাককে ঢাকার পরিচ্ছন্নতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন বাজার তদারকে গিয়ে ফেসবুক লাইভ, ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা যায়। এসব ভিডিওর অনেকটিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের উদ্দেশে ‘প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে নিজেই জনতাকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাকশন নেবেন’– এমন আগ্রাসী বক্তব্য দেন।
আইন বিশ্লেষকরা মনে করেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর কাজ হলো নীতিনির্ধারণ করা এবং প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া। নিজেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তির জন্য সমীচীন নয়।
এর আগে মন্ত্রী হিসেবে শপথ ও দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এর বাইরে রাজধানীর মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় গত ১ অক্টোবর বিএনপিদলীয় সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
- বিষয় :
- রাজনীতি