ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লাখে ১৫ হাজার টাকা সুদের ফাঁদ

লাখে ১৫ হাজার টাকা সুদের ফাঁদ
×

প্রতারণায় অভিযুক্ত হান্নান মিয়াজী সমকাল

 এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) 

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫ | ০০:৪৯

এক লাখে মাসে লভ্যাংশ (সুদ) ১০-১৫ হাজার টাকা। অতি লাভের লোভ দেখিয়ে অন্তত এক হাজার মানুষকে ফাঁদে ফেলেছেন তিনি। কারও কাছ থেকে নিয়েছেন এক লাখ, কারও কাছ থেকে ৫ লাখ, সর্বোচ্চ এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা নিয়েছেন। প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত সুদ দিলেও, পরে আর তার দেখা পাননি  লগ্নিকারকরা। ইউটিউব ও ফেসবুকে বিনিয়োগের নামে চুক্তিতে প্রায় শতকোটি টাকা নিয়ে হাওয়া  সেই প্রতারক। তার নাম হান্নান মিয়াজি। 
সম্প্রতি নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগে হান্নান মিয়াজীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সীতাকুণ্ড থানায়। পুলিশ হান্নানকে গ্রেপ্তার করেছে। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মজিবুর রহমান বলেন, ‘হান্নান মিয়াজীর বিরুদ্ধে অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন। প্রায় শতকোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একটি মামলা হয়েছে, অন্য অভিযোগগুলোও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 
এদিকে, হান্নান মিয়াজী এখন কারাগার থেকেই বিনিয়োগকারীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। তিনি অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভয় দেখাচ্ছেন। ২৫ বছর বয়সী হান্নান মিয়াজী সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের কেদারখীল গ্রামের আবু সালেকের পুত্র। তিনি নিজেকে ফ্রিল্যান্সার দাবি করেন। এলাকায় সবাই তাকে ‘ফ্রিল্যান্সার হান্নান’ নামে চেনেন। 
জানা যায়, ইউটিউব ও ফেসবুকে বিনিয়োগের চুক্তিতে প্রতি লাখে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলে মানুষকে আকৃষ্ট করেন হান্নান মিয়াজী। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ২-৩ মাস লভ্যাংশ পরিশোধ করেন। এতে তাকে টাকা দেওয়ার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বিনিয়োগকারী জুটাতে কমিশনভিত্তিক শতাধিক প্রতিনিধিও নিয়োগ দেন হান্নান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতি লোভে অনেকে জমি বিক্রি করেও টাকা দেন। কেউ ব্যাংকের ফিক্স ডিপোজিট ভেঙে, কেউ এনজিও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েও হান্নান মিয়াজীর কাছে বিনিয়োগ করেন। অনেকে দেন জমানো শেষ অর্থটুকু। এভাবে বিনিয়োগকারীদের শতকোটি টাকা ঢুকে হান্নান মিয়াজির পকেটে। 
তসলিম উদ্দিন নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘আমি আব্দুল হান্নান মিয়াজীর অফিসে 
চাকরি করতাম। যার কারণে আমিও আত্মীয়-স্বজন থেকে ধার করে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। প্রথম দুই মাস চুক্তি অনুযায়ী লাভ দিলেও দীর্ঘ সাত-আট মাস ধরে দিচ্ছে না।’ লিয়াকত সিকদার ও হেকমত মোল্লা বলেন, ‘২৫ বছরের এক তরুণ সাধারণ মানুষের থেকে ইউটিউব ও ফেসবুকের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিল আর এ ব্যাপারে প্রশাসন কিছুই জানল না–এটা হতে পারে না। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই প্রতারণা করেছে সে। তবে যারা বিনিয়োগ করেছে তারাও দায়ী, কারণ অস্বাভাবিক কোনো কিছু বেশিদিন টেকসই হয় না। লাখ টাকায় ১০ মাসে ১০ হাজার টাকা সুদ দেওয়া অবাস্তব।’
একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আব্দুল হান্নান মিয়াজী ও তার প্রতিনিধিরা বান্ডেল বান্ডেল টাকা গুনে বস্তার মধ্যে ভরছেন। দেখা গেছে, ফেসবুক ও ইউটিউবে প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগের অনেক চুক্তিপত্রের কপিও। হান্নান মিয়াজী পুলিশদের গতিবিধি দেখার জন্য তার বাড়ির অর্ধকিলোমিটারজুড়ে স্থাপন করেন সিসি ক্যামেরা। 
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ইউটিউব ও ফেসবুকে প্ল্যাটফর্মে ব্যবসার জন্য নেওয়া প্রতি লাখে মাসে ১৫ হাজার টাকা করে লভ্যাংশ দেওয়া হবে। আব্দুল হান্নান মিয়াজীর প্রতিনিধি নুর খান অনেক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন।
বিনিয়োগকারীর এক আত্নীয় মাসুদ মোল্লা বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে হান্নান মিয়াজির কাছে মানুষ টাকা দিচ্ছেন। আমার এক আত্মীয় প্রায় ৪০ লাখ টাকার মত বিনিয়োগ করেছেন। এই বিনিয়োগে আমার টাকাও আছে। ব্যাংকে রাখা ফিক্স ডিপোজিট ভেঙে টাকা দিয়েছি। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। হান্নান মিয়াজি এখন বড় রাঘববোয়ালদের ছত্রছায়ায় রয়েছেন।
প্রখ্যাত ফ্রিল্যান্সার আপট্রার্ন আইডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জোনাকি খানম বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং করতে বিনিয়োগ বলতে অভিজ্ঞতা, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই লাগে না। ফ্রিল্যান্সিংয়ে অর্থ বিনিয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্রি–ল্যান্সার বা ফ্রি–ল্যান্সিং সবাই হতে পারেন। কিন্তু চুক্তি করে ইউটিউব–ফেসবুকে অর্থ বিনিয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই। অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে টাকা নেওয়া সম্পূর্ণ প্রতারণা। এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
 

আরও পড়ুন

×