ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

চিকুনগুনিয়ার টেস্ট ফি ডেঙ্গুর ১৬ গুণ

চিকুনগুনিয়ার টেস্ট ফি ডেঙ্গুর ১৬ গুণ
×

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সমকাল

 সারোয়ার সুমন

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৮

এডিস মশার কামড়েই হয় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। দুটি রোগের লক্ষণও প্রায় একই রকম। তেমন ভিন্নতা নেই চিকিৎসা পদ্ধতিতেও। তবু চট্টগ্রামে এ দুটি রোগের ল্যাব টেস্টের ফিতে বিশাল ব্যবধান। ডেঙ্গু রোগের রক্ত পরীক্ষা করা যায় ৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। কিন্তু চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করাতে গেলে গুনতে হচ্ছে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এটি ডেঙ্গু পরীক্ষার তুলনায় প্রায় ১৬ গুণ বেশি। এই যেমন এপিক হেলথ কেয়ারে চিকুনগুনিয়ার আরটি-পিসিআর পরীক্ষা ফি ৫ হাজার ১০০ টাকা। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে এটি ৪ হাজার টাকা।  আবার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গুনতে হবে ৫ হাজার টাকা। 
এ ছাড়া শেভরনে চিকুনগুনিয়া (আরটিপিসিআর) পরীক্ষায় আগে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হলেও এখন নেওয়া হচ্ছে ৪৫০০ টাকা, মেট্রো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকুনগুনিয়া (আরটিপিসিআর) ৫ হাজার টাকা, ম্যাক্স হাসপাতালে  চিকুনগুনিয়া (আরটিপিসিআর) ৪৫০০ টাকা এবং ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া (আরটিপিসিআর) পরীক্ষায় নেওয়া হচ্ছে ৪৫০০ টাকা।
 চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায়  আক্রান্ত। এ দুটি রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতিও প্রায় একই রকম। পরীক্ষার ফি কাছাকাছি থাকার কথা। কিন্তু এ দুটো রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এবার অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি। এটাকে পুঁজি করে কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার গলাকাটা ব্যবসা করছে। সরকারি হাসপাতালে কিট না থাকায় তারা চিকুনগুনিয়ার টেস্ট করতে পারছে না। আবার সরকার এখনও ডেঙ্গুর মতো চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়নি। এটিকে যারা সুযোগ হিসেবে নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব আমরা।  
১৬ গুণ মূল্য নেওয়ার নেপথ্যে চার কারণ : চার কারণে টেস্ট নিয়ে এমন অকল্পনীয় ব্যবসা করছে চট্টগ্রামের ল্যাবগুলো। ডেঙ্গু রোগের টেস্টে কত টাকা ফি নেওয়া যাবে; তা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে তা এখনও ঠিক করা হয়নি। তাছাড়া টেস্ট করার কিট নেই চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোয়। আবার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। টেস্ট নিয়ে এমন মনোপলি ব্যবসা চলার এটাও একটা কারণ বলে মনে করেন সাধারণ রোগীরা। চট্টগ্রামের অর্ধশত ডায়াগনস্টিক সেন্টার চোখের সামনে এমন অন্যায় করলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। 
ডেঙ্গুতে সরকার নির্ধারিত ফি : সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ৩০ জানুয়ারি সরকার ঘোষিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় এনএস ফর ডেঙ্গু, আইজিজি ফর ডেঙ্গু ও আইজিএম ফর ডেঙ্গু পরীক্ষার সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি হলো ৫০ টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকটি আদেশে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় এনএস ফর ডেঙ্গু, আইজিজি ফর ডেঙ্গু ও আইজিএম ফর ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিবিসি পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ টাকা।  
কিট চেয়ে চিঠি: সরকারি হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা শুরু করতে কিটের চাহিদা দিয়ে গত ২৮ জুলাই অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ল্যাবরেটরি, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইনফেকসাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি)-এ পিসিআর (আরটি-পিসিআর) ল্যাব থাকলেও চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার কিট না থাকায় সরকারি পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হচ্ছ না বলে উল্লেখ করা হয়। চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক র‍্যাপিড টেস্ট কিট সরবরাহের জন্য অনুরোধ জানানো হয় এই চিঠিতে।
আক্রান্ত বাড়ছে হু হু করে : চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯৮৪ জন। ৩০ জুলাই একদিনেই শনাক্ত হয়েছে ১০৯ জন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৬৫ জন। এর মধ্যে ৩০ জুলাই একদিনেই আক্রান্ত হন ২৩ জন। ডাক্তাররা বলছেন, আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। রোগীদের অনেকে তথ্য নথিভুক্ত করছে না। আবার হাসপাতালে না গিয়ে ঘরে থেকেই চিকিৎসা নেন অনেক রোগী।  
সম্প্রতি এডিস মশাবাহিত রোগের জন্য চট্টগ্রাম নগরীকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগরের ছয়টি এলাকায় জরিপ চালিয়ে ১২৮টি বাড়ির মধ্যে ৬২টিতে লার্ভা খুঁজে পাওয়া যায়; যার হার দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া আইইডিসিআরের গবেষণায় লার্ভার ঘনত্ব পাওয়া গেছে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে নগরের আগ্রাবাদে।  
যেভাবে শনাক্ত করা হয় চিকুনগুনিয়া: চিকুনগুনিয়া শনাক্তের প্রক্রিয়া সর্ম্পকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের  সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন,  ‘চিকুনগুনিয়া শনাক্তে সেরোলজিক্যাল রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। যার মাধ্যমে রক্তে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়।’
রোগী এসে ফিরে যাচ্ছেন সরকারি হাসপাতাল থেকে: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষ। কিন্তু এই দুটি হাসপাতালে নেই চিকুনগুনিয়া শনাক্তে কোনো কিট। তাই হাসপাতালে আসা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। 
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘চিকুনগুনিয়ার রোগীর হার এবার অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারিভাবে রোগীরা আমাদের এখানে ডাক্তার দেখাতে পারলেও, কিট না থাকায় পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কিটসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’  অথচ 


দুই হাসপাতালের শুধুমাত্র বহিঃবিভাগেই প্রতিদিন জ্বর নিয়ে গড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। 
এই মুহূর্তে যা করা দরকার : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. এস এম মোস্তাকিম জানান, চিকুনগুনিয়া শনাক্তে প্রয়োজন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) মেশিন। এটি হল একটি পরীক্ষাগার পদ্ধতি যা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় নির্দিষ্ট ডিএনএ সিকোয়েন্সের কপি দ্রুত বৃদ্ধি করতে। এরফলে রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন সম্ভব হয়। এছাড়াও প্রয়োজন হয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে একটি ডেডিকেটেড ল্যাব। সেইসাথে প্রয়োজন পরীক্ষা করানোর কিট। আর পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করতে প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবল ও অনূকূল অবকাঠামো। এই মুহূর্তে  এসবের কিছুই নেই চমেক কিংবা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু এ্ই সুবিদা নিশ্চিত করা দরকার জরুরি ভিত্তিতে।  
 

আরও পড়ুন

×