লক্ষ্মীপুরে ৭০ কোটি টাকার সুপারি
গাছ থেকে নামানোর পর বাগানেই বিক্রি হয়ে যায় সুপারি, চাষিরা ছোট-বড় বাছাই করে দর দেন সমকাল
আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘সুপারির রাজ্য’ লক্ষ্মীপুর। চলতি বছর জেলায় সুপারির বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে এবার জেলায় সুপারির উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার টন; যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩ হাজার টন বেশি। তবে বাজারদর কম থাকায় কৃষকরা হতাশ। তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ইচ্ছে করে সুপারির দাম কমিয়ে দিয়েছে। আবার ফলন বেশি হওয়ায় সুপারি চুরির ঘটনাও বেড়ে গেছে; এতে শঙ্কায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় উৎপাদিত হয়েছে ৪৩ হাজার টন সুপারির বাজার। প্রতি কেজি সুপারির দাম ১৬৫ টাকা হারে এক টনের দাম ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ৪৩ হাজার টন সুপারির দাম প্রায় ৭০ কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে সুপারির আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টরে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার টন, উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার টন। এ মৌসুমে সুপারি থেকে ৭০ কোটি টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছি। জাত উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প প্রতিষ্ঠা হলে কৃষক আরও লাভবান হবেন।’
স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, এ বছর উৎপাদন বেশি হলেও সিন্ডিকেটের কারণে বাজার মূল্য কম। বাজারে ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে সুপারির একটা গড় দাম বেঁধে দিয়েছে তারা। গত বছর স্থানীয় হিসাব পদ্ধিতিতে প্রতি পন (৮০ পিস) সুপারি বিক্রি হয়েছিল ১৮০-২০০ টাকায়। এবার দাম কমে দাঁড়িয়েছে ১২০-১৫০ টাকায়। পশ্চিম লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক মিজান হোসেন বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ফলন বেশি হইছে। কিন্তু আগের মতো দাম পাইতেছি না। সুপারি বিক্রি করলে লাভের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি মনে হয়।’ রায়পুরের উত্তর চরবংশী গ্রামের খোকন সর্দার বলেন, ‘বাগান দেইখা ভালো লাগে, কিন্তু বাজারে গেলে বুকটা ভেঙে যায়, এত ফলনের পরও দাম কম। এভাবে টিকতে পারমু না।’
এদিকে বেড়েছে সুপারি চুরি। রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী, উত্তর চর আবাবিল, সোনাপুর, রাখালিয়া, চর মোহনা এবং পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডে নিয়মিত চুরির ঘটনা ঘটছে। রাতের আঁধারে চোরের দল বাগানে ঢুকে সুপারি নিয়ে যাচ্ছে। উত্তর চরবংশীর কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাগানে দুই সপ্তাহে তিনবার চুরি হইছে। প্রতিবার দুই-তিন টাঙ্গা সুপারি নিয়ে গেছে। থানায় গেলে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না, উল্টো খরচটাই বেশি পড়ে; তাই যাই না। পুলিশি টহল বাড়াইলে আমরা বাঁচি।’
চর মোহনার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এক টাঙ্গায় ২০০-২৫০ টাকার সুপারি থাকে। মামলা করতে গেলে গাড়ি ভাড়া, সময়, সব মিলিয়ে তার চেয়ে বেশি খরচ পড়ে। তাই সবাই চুপ থাকে।’ কৃষকদের দাবি, রাতে পুলিশি টহল বাড়াতে হবে, গ্রাম পুলিশকে সক্রিয় করতে হবে আর চোরচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
লক্ষ্মীপুরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রায়পুরের হায়দরগঞ্জ। সপ্তাহে দুদিন এখানে লাখ লাখ টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়। এছাড়া দালাল বাজার, লক্ষ্মীপুর সদর, মান্দারী, কমলনগরের হাজিরহাটসহ বিভিন্ন বাজারে বেচাকেনা জমজমাট।
হায়দরগঞ্জের পাইকারি সুপারি ব্যবসায়ী মিজান মিয়া বলেন, ‘এখানকার সুপারি মানসম্মত, দেশজুড়ে চাহিদা আছে। কিন্তু এবার উৎপাদন বেশি হইছে, তাই দামও একটু কম।’
- বিষয় :
- সুপারি
