ফটিকছড়িতে বিস্তীর্ণ বিলের কান্না
কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় পুকুরের মতো গর্ত তৈরি হয়েছে। ছবিটি ফটিকছড়ির পাইন্দং জুগনিঘাটা বিল থেকে তোলা সমকাল
ইকবাল হোসেন মনজু, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফটিকছড়ি উপজেলায় কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগ (টপসয়েল) রাতের আঁধারে কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে ধানিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। পরিবেশ আইন ও কৃষিজমি সুরক্ষা নীতিমালা উপেক্ষা করে ইটভাটার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে একটি মাটিখেকো চক্র এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়ার পর অভিযান চালিয়ে মাটি কাটায় ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর জব্দ করা হয়। তবে অবৈধ টপসয়েল কাটা বন্ধ হয়নি। রাত নামলেই আবারও শুরু হয় ভেকু মেশিন ও ড্রাম ট্রাকের দাপট।
গত ২৪ ডিসেম্বর পাইন্দং ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি এরশাদ উল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন– ‘কার হাত লম্বা? মাটি ব্যবসায়ী নাকি প্রশাসনের? পাইন্দংয়ে রাত নামলেই চলে ভেকু আর ড্রাম ট্রাকের নগ্ন উল্লাস। মাটি তো আর চিৎকার করতে পারে না, করে নীরব কান্না।’
এই পোস্ট স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালী ইটভাটার মালিকরাই এসব মাটি কাটছে। কিছু বললে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেয়। আমাদের জমির ওপর দিয়েই মাটি বহন করা হচ্ছে, ভয়ে মুখ খুলতে পারি না।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পাইন্দং ইউনিয়নের জুগনিঘাটা এলাকায় ধান কাটার মৌসুম শেষ হওয়ার পর গত ডিসেম্বর মাস থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ভোর পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০টি ড্রাম ট্রাকে করে কৃষিজমির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। উপজেলার কাঞ্চননগর, বাগানবাজার, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, ভূজপুর, হারুয়ালছড়ি, খিরাম ও সমিতিরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন ধানিজমি থেকেও টপসয়েল কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভারী ট্রাকে মাটি পরিবহনের ফলে গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে চরম ভোগান্তি। সবচেয়ে বেশি মাটি কাটা হচ্ছে পাইন্দং ইউনিয়নে। ইউপির জুগনিঘাটা ব্রিজের পূর্ব পাশে প্রায় ৪০০ শতক কৃষিজমি থেকে রাতের আঁধারে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে উপরিভাগ কাটার ফলে বিস্তীর্ণ বিলের অনেক স্থানে পুকুরের মতো গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। অথচ এসব জমিতে প্রতিবছর বোরো ও আমন মৌসুমে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো। চলতি বছরেও এসব জমিতে ফসল ফলানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভেকু মেশিন দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে ডাম্প ট্রাক ভর্তি করে সরাসরি ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এতে জমির উর্বর শক্তি দ্রুত কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মাটিভর্তি ট্রাক চলাচল করায় এলাকার পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী ও জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের না জানিয়ে পারিবারিক জমি থেকে মাটি কেটে পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে। শুধু আমাদের না, পুরো পাইন্দং ইউনিয়নেই এভাবে টপসয়েল কাটা হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বলেন, ‘যারা মাটি কাটছে, তাদের নাম আশপাশের ইটভাটাগুলোয় গেলেই পাওয়া যাবে। আমরা প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরা খুবই ক্ষমতাবান।’
এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘অবৈধভাবে কৃষিজমির টপসয়েল কাটার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
- বিষয় :
- জমি উদ্ধার
