টিকিট কেটে ফুলবাগানে মানুষের ঢল
চর পাথরঘাটার ইছানগর গ্রামে ব্রাদার্স এগ্রো পার্কে ফুলের শোভায় মুগ্ধ দর্শনার্থীরা সমকাল
আকরাম হোসেন রানা, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চর পাথরঘাটার ইছানগর গ্রাম। যে বিস্তৃত মাঠে আগে ধানের শীষে জমত শিশির বিন্দু, সেখানে আজ সূর্যমুখীর উজ্জ্বল হাসি। সেই হাসির বাঁধ ভাঙে কসমসের কোমল রঙে। পরিচিত কৃষি মাঠ নীরবে বদলে গেছে ফুলের বাগানে।
স্থানীয় নিজাম উদ্দীন ইমতিয়াজ পারিবারিক ৬ একর জমিতে এই গড়ে তুলেছেন ‘ব্রাদার্স এগ্রো পার্ক’। পার্ক আসলে পার্ক নয়, চারদিকে কেবল ফুলের মেলা। সারাবেলা বাগানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। কেউ ছবি তুলেন, কেউ পার্কের দোলনায় বসে সময় কাটান, কেউ নিঃশব্দে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দেখা যায়, পুরো মাঠজুড়ে সূর্যমুখী, কসমস, সরিষা, চায়না গাঁদা, জাপানি গাঁদা, জিনিয়া, কাকতুরি ও পিটুনিয়াসহ বাহারি ফুলের সমারোহ। সূর্যমুখী ও সরিষার বীজ বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অংশ পাখিদের জন্য রেখে দেবেন মালিক ইমতিয়া। সামনে পাখির অভয়ারণ্য করারও চিন্তা আছে তার।
দর্শনার্থী কলেজছাত্র সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামের মধ্যে এমন ফুলের বাগান হবে কখনও ভাবিনি। বন্ধুদের নিয়ে ছবি তুলছি, সময় কীভাবে চলে যাচ্ছে বুঝতেই পারছি না। এটা শুধু একটি পার্ক নয়, আমাদের এলাকার গর্ব।’
চট্টগ্রাম শহর থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা গৃহবধূ নাসরিন আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে খোলা জায়গায় ঘোরার সুযোগ খুব কম। এখানে এসে দেখি পার্ক আর ফুল বাগানের সৌন্দর্য একই সঙ্গে উপভোগ করা যায়। বাচ্চারা পার্কের দোলনায় খেলছে, ফুল দেখছে। গ্রামের মধ্যে এমন সুন্দর পরিবেশ থাকলে মানুষ আর বাইরে যেতে চাইবে না।’ স্থানীয় কৃষক আবদুল করিম বলেন, ‘আগে এই জমিতে ধান চাষ হতো। এখন ফুলের কারণে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে, কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে।’
পার্কের মালিক ইমতিয়াজ জানান, কয়েক বছর আগেও এই জমিতে ধান ও মাছের চাষ হতো। তবে কৃষি উপকরণ ও বীজের দাম বাড়ায় চাষাবাদে আগের মতো লাভ হচ্ছিল না। চার বছর আগে তিনি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সবজি চাষের পাশাপাশি ধান, সরিষা ও মৌসুমি মাছ চক্রাকারে চাষ শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা কৃষি দপ্তরের পরামর্শে সরিষা ও সূর্যমুখী চাষ শুরু করার পর আমার ফুল বাগানের প্রতি মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ে। ফুল ফুটলেই লোকজন দেখতে আসতেন। সেই অভিজ্ঞতা বড় পরিসরে ফুল বাগান করতে আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এবার বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি বিশাল জায়গাজুড়ে আট প্রজাতির ফুলের চাষ করেছি।’ ইমতিয়াজ বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কাজ শুরু করি। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফুল ফুটতেই দর্শনার্থী আসতে শুরু করে। সাধারণ কৃষিজমি যে এভাবে ফুলের রাজ্যে বদলে যেতে পারে, তা নিজেও ভাবতে পারিনি।’
পার্কে প্রবেশের জন্য ৫০ টাকা টিকিট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কর্মীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে টিকিট চালু করতে হয়েছে। মাসে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। কৃষি থেকে যে আয় হয়, তা কৃষিতেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে।’
তবে তাঁর ভাবনা শুধু ফুলের বাগানেই সীমাবদ্ধ নয়। আসন্ন বসন্তে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সূর্যমুখী ও সরিষার বীজ বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অংশ পাখিদের জন্য রেখে দেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। ভবিষ্যতে এখানে একটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে চান। যেখানে সাধারণ কৃষক প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন, গবেষকরা কাজ করতে পারবেন এবং কৃষিকে ঘিরে শেখার একটি কেন্দ্র তৈরি হবে।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজিব কান্তি রুদ্র বলেন, ‘কৃষি খাতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এমন ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ প্রশংসনীয়। উপজেলা কৃষি দপ্তর সবসময় এ ধরনের কার্যক্রমকে উৎসাহ দিয়ে থাকে।’
- বিষয় :
- ফুলচাষি
