ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরের ৩৭ পাহাড় ঘিরে বেপরোয়া সন্ত্রাসীরা

আশ্রয় দেন রাজনীতিকরা প্রশ্রয় দেয় প্রশাসন

আশ্রয় দেন রাজনীতিকরা প্রশ্রয় দেয় প্রশাসন
×

 সারোয়ার সুমন  

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে তিন হাজার একর সরকারি ভূমির ভাগবাটোয়ারা। ৩৭টি পাহাড় ও আটটি টিলায় থাকা এই ভূমি প্লট আকারে বেচাকেনা করছে কিছু ভূমি দস্যু। যখন যার ক্ষমতা থাকে তখন তার আশ্রয়ে গিয়ে এই বাণিজ্য পরিচালনা করে তারা। আগে আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে ছিল যারা তারা এখন ছায়া খুঁজছে বিএনপি থেকে।  রাজনীতিবিদরা এমন আশ্রয় দেওয়ার কারণে সেখানে বেপরোয়া থাকে ভূমি দস্যুরা। জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে প্রশাসন থেকেও। দুই দশক ধরে এই এলাকা অপরাধীদের অভয়রাণ্য হলেও সেখানে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ কিংবা বিজিবি নিয়ে টানা কোনো সমন্বিত অভিযান চালায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অথচ গত দুই দশকে এখানে এক ডজনেরও বেশি মানুষ খুন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৫ আগস্টের পর লাশ পড়েছে ৫টি।
প্রতিটি খুনের পর লোক দেখানো কিছু অভিযান পরিচালনা করে প্রশাসন। কিন্তু সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে পারেনি তারা। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও বাহিনীপ্রধানদের শাস্তিও নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। তাই ইয়াসিন, মশিউর, ফারুকরা গ্রেপ্তার হলেও বের হয়ে গেছে জামিনে। বন্ধ হয়নি সেখানকার হানাহানি। বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটাও। প্রশাসনের চোখের সামনেই সাবাড় হয়েছে সেখানকার ৩৭টি পাহাড়। বসতি গড়ে উঠেছে ৫০ হাজার মানুষের। সেখানে সংযোগ গেছে বিদ্যুতের। ব্যবস্থা আছে পানিরও। 

রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে মাইকে ঘোষণা এবং হামলাকারীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নে র‌্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, ‘র‌্যাব কিছু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল। এই সন্ত্রাসীরাই র‌্যাবের ওপর আক্রমণ করেছে। আমরা তাদের নাম পেয়েছি এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমরা পুরো বিষয় তদন্ত করব। এই ঘটনায় যদি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকে সেটিও খুঁজে বের করবে তদন্ত কর্মকর্তা।’ তবে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের র‌্যাব সদস্য নিহতের ঘটনায় বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যা প্রকাশিত হচ্ছে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ তবে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিন বলেন, ‘আসলাম চৌধুরীর কারণেই অশান্তি হচ্ছে জঙ্গল সলিমপুরে। সন্ত্রাসী রোকনকে দিয়ে সে অশান্ত করে রেখেছে এই এলাকা।’ তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে রোকন সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের কোনো সন্ত্রাসী ঘটনায় সে যুক্ত নেই।’ 

যারা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সাম্রাজ্য
দেশে আলাদা আইন-আদালত থাকলেও জঙ্গল সলিমপুরে থাকা ৫০ হাজার মানুষের কাছে রোকন ও ইয়াসিনের কথায় এখানে আইন। এখানকার বাসিন্দাদেরও প্রবেশ করতে লাগে বাহিনী প্রধানের স্বাক্ষরিত পাস। পুলিশ জানায়, আগে এই পাস দিতেন চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি গাজী সাদেকুর রহমান, সেক্রেটারি কাজী মশিউর রহমান ও সলিমপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য গোলাম গফুর। ৫ আগস্টের পর এরা রোকন বাহিনীর সঙ্গে আছে। এই বাহিনীতে আরও আছে মামুন, মঞ্জুরুল, রাজু, ইলিয়াছ, লুৎফর, মাহিদ, নুরুল আলম মনা, রনি, কাসেম, সোহেল, রামেদ ও বেলাল। অন্যদিকে আলীনগর সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণ আছে সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাকিম, সেক্রেটারি মো. ইয়াসীন, তার ভাই মো. ফারুক, হাসান, জামাই ফারুক, নুরুল হক ভাণ্ডারী, জেলাল, জামাই ইয়াছিন, বেদা মামুন, শাহেদ আলী, মেজবাহ, শাহিনও নুর হোসেনের হাতে।  এখন এদের পদবি পরিবর্তন হয়েছে। দলও পরিবর্তন করেছে তারা। ক্ষমতার পালাবদলে বাহিনীপ্রধান হয়েছেন রোকন উদ্দিন ও ইয়াসিন মিয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুই বাহিনী প্রধানের কথা ছাড়া পাতাও নড়ে না ৩৭ পাহাড়ে। 

সরকারি প্রতিবেদনে যেভাবে উঠে আসে জঙ্গল সলিমপুর
সীতাকুণ্ডের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুহুল আমিন জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে ইতিপূর্বে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। কেটে ফেলা পাহাড়গুলোর কোনটি কোন বিএস দাগ নম্বরে, সেটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিবেদনে ভূমিদস্যুরা ৩৭টি পাহাড় ও আটটি টিলা কেটে কোথায় কী স্থাপনা গড়ে তুলেছে, সেটিও উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরে ৩৪টি পাহাড় ও আটটি টিলা কেটে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ১৩ হাজার ৯০০ প্লট তৈরি করে। তিনটি কেজি স্কুল, একটি প্রাইমারি স্কুল, একটি হাই স্কুল, একটি কাঁচাবাজার ও প্রায় ৪০০ দোকানও করা হয়েছে। প্রতিটি পাহাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার আছে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে এখানে ছয়টি ব্রিজ ও ১৫টি কালভার্টও নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ নামে আরেকটি সংগঠন তিনটি পাহাড় কেটে গড়ে তুলেছে প্রায় পাঁচ হাজার প্লট। 

অভিযান হলেই হামলা
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে র‌্যাবের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের লোকজনকে বাধা দেওয়া হয়। আবার ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগর এলাকায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে সেখানকার সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গত বছরের অক্টোবরে সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক। ২০১৯ সালে একবার অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান চলছে। অতীতেও কয়েক দফা এমন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেখানে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়।’

আরও পড়ুন

×